লেবাননে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বু হাবিব বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করার পর থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে। হামলার আগে লেবাননে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। কিন্তু কয়েক দিন ধরে লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলা বাড়তে থাকায় লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
লেবাননের ক্রমবর্ধমান সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন দক্ষিণ লেবাননের প্রবাসীরা। হামলার তীব্রতা বাড়ছে বৈরুতেও। জীবন বাঁচাতে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে চলে গেছেন অন্য কোনো শহরে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাংলাদেশীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে কাজ করছে। তারা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে বাংলাদেশীদের খাবার দেয়ার পাশাপাশি তাদের খোঁজখবর রাখছেন।
জানা গেছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত তিনজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বৈরুতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে যারা যোগাযোগ করছে, তাদের সবাইকে সহায়তা করছি। আশ্রয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে দূতাবাসের পক্ষ থেকে। দূতাবাস নিজস্ব তত্ত্বাবধানে দুই হাজারের মতো প্রবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। এর বাইরেও বিভিন্ন স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশিদের দেখভাল করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননে দুই শতাধিক প্রবাসীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তারা নিরাপদে আছেন। বর্তমানে সব মিলিয়ে লেবাননে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন বলেও জানান মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর লেবাননে কর্মী যাওয়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৩ সালে দেশটিতে কর্মী ভিসায় যান ২ হাজার ৫৯৪ জন। চলতি বছর প্রথম সাত মাসে গেছেন ৪ হাজার ২২৫ জন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, লেবাননে নিরাপত্তা শঙ্কা না থাকলে কর্মী যাওয়ার এ প্রবাহ আরও বাড়ত।
লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বৈরুতের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় আক্রমণ শুরু হয়েছে। রোববার কিছুটা শান্ত ছিল। তবে সব জায়গায় যান চলাচল কম।
বৈরুতের প্রবাসী রফিকুল ইসলাম জানান, পুরো রাজধানীতে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। রাস্তাঘাটও ফাঁকা। অনেক বাংলাদেশি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এসে বৈরুতে আশ্রয় নিয়েছেন। নানা কারণে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে এখনো যেতে পারেননি। অনেক প্রবাসীই দেশে ফিরতে চাইছেন। কিন্তু সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বৈরুতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈরুতের উত্তরে অথবা অন্য কোনো নিরাপদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত এক সপ্তাহ দক্ষিণ বৈরুতের কিছু এলাকায় ক্রমাগত বিমান আক্রমণ চালানো হচ্ছে। আক্রমণের ধারায় প্রতীয়মান হয় যে দাহি ও এর নিকটবর্তী এলাকায় বসবাস করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমন অবস্থায় যেসব বাংলাদেশি প্রবাসী এখনো ওই এলাকায় অথবা এর অতি নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করছেন, তাদের অতিসত্তর ওই এলাকা ত্যাগ করে বৈরুতের উত্তরে অথবা অন্য কোনো নিরাপদ এলাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলো।
বিজ্ঞপ্তিতে জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের ফ্রন্টডেস্ক (৭১২১৭১৩৯), হটলাইন (৭০৬৩৫২৭৮) কিংবা হেল্পলাইন (৮১৭৪৪২০৭) নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
প্রবাসীদের উদ্দেশে লেবাননে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এয়ার ভাইস মার্শাল জাভেদ তানভীর খান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে, অনুগ্রহ করে আপনার নিজ নিজ অবস্থানে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করুন। আপনি যদি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, আমাদের দ্রুত জানান; আমরা আন্তরিক প্রচেষ্টার সঙ্গে আপনাকে সমর্থন করার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।