সরকারকে উদ্দেশ্য করে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা নির্ভয়ে সত্য কথা বলতে পারে। সরকারের বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্প জনগণের টাকায় হয় এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক সমাজ ও নৈতিক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার এটাই উপযুক্ত সময়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলনে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের সামাজিক ডাক্তার বলে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, শরীরে রোগ আছে কিনা জানতে যেমন মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়; তেমনি সাংবাদিকরাও সোশ্যাল ডক্টর (সামাজিক ডাক্তার)। সবসময় তাদের কাজই হল সমাজ পরিচালনার সীমাবদ্ধ ও ব্যর্থতাগুলোকে তুলে ধরা।
সম্মিলনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলেন মাহফুজ আনাম। তার মধ্যে তৃতীয় বিষয়ে কথা বলেন সংবাদপত্রের মালিকদের প্রসঙ্গে। এসময় তিনি সংবাদপত্রের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যারা সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করেন, তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে যে বিনিয়োগ করেন, সেই মানসিকতা নিয়েই যদি গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করেন; তাহলে সেই গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করবে না।’
মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি সাংবাদিকতাকে মনে করি, উই আর সোশ্যাল ডক্টর, আমরা সামাজিক ডাক্তার। আমি যখন একটা ডাক্তারের কাছে যাই, কেন যাই? আমি জানতে চাই আমার শারীরিক কোনো অসুখ আছে কিনা, দুর্বলতা আছে কিনা, আমার কোলেস্টেরলের অবস্থা কী, আমার ভিটামিনের অবস্থা কী; অর্থাৎ আমার নেগেটিভ ইস্যুগুলোই জানতে চাই। আমি ডাক্তারের কাছে এটা শুনতে যাই না যে ইউ আর লুকিং ভেরি হ্যান্ডসাম, ইউ আর লুকিং ভেরি বিউটিফুল। একইভাবে সাংবাদিকরা সোশ্যাল ডক্টর।
দেশের উন্নতির জন্য কেউ হয়তো বিনিয়োগ করে চাকরি সৃষ্টি করছেন, আর সাংবাদিকরা ত্রুটি ধরে সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক।
তিনি সংবাদপত্রের মালিকপক্ষকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা যদি আপনাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সাংবাদিকতাকে বাধ্য করেন, তাহলে সেই সাংবাদিকতা কিন্তু জনগণ গ্রহণ করবে না।’ সংবাদপত্রের মালিকপক্ষের একটি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ রাখার অনুরোধ করেন তিনি।
সম্মিলনে বক্তব্যের শুরুতেই মাহফুজ আনাম সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, সাংবাদিকতার মূল অস্তিত্বই হলো সমাজসেবা। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধানে বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম এই দুই পেশাকেই বিশেষভাবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, কারণ শক্তিশালী স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া কোনো সমাজ গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
এরপর তিনি গণমাধ্যমের সম্পাদকদের উদ্দেশে বলেন, একজন সম্পাদকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণ পুরো প্রতিষ্ঠান ও পেশাকে প্রভাবিত করে। সম্পাদক হিসেবে নৈতিকতা ও পেশাগত মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি ঘটলে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো সাংবাদিকতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এসময় তিনি বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা একে অপরের পরিপূরক। ‘কনটেম্পট অব কোর্ট’ যেন স্বাধীন সাংবাদিকতা দমনের হাতিয়ার না হয়, সেই অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।