চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া গন্ধ, কালশী বস্তিতে হাহাকার!

চারপাশে কেবলই পোড়া গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপ। তার মাঝেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া টিন, কাঠ, জামাকাপড় ও গৃহস্থালির নানা ভাঙাচোরা আসবাবপত্র। সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর কেউ ছাইয়ের ভেতর থেকে অক্ষত কিছু খুঁজে পাওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন, আবার কেউ অবশিষ্টাংশ কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বেচে দু-পয়সা আয়ের পথ খুঁজছেন। আর মাত্র একটা দিন পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। গোটা দেশ যখন কোরবানির ঈদের আনন্দে ভাসছে, ঠিক তখনই রাজধানীর কালশী এলাকার বাউনিয়াবাঁধ বস্তির শত শত ছিন্নমূল মানুষের মাথার ওপর বেঁচে থাকার ন্যূনতম আশ্রয়টুকুও অবশিষ্ট নেই।

এর আগে সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যার দিকে পল্লবীর কালশীর এই বস্তিটিতে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ ও আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই ভয়াবহ আগুনে বস্তির প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে পোড়া ভিটেমাটি থেকে যদি মূল্যবান কিছু উদ্ধার করা যায়, সেই আশায় হন্যে হয়ে ঘুরছেন সর্বহারা মানুষেরা। এদিকে দুর্গত এই মানুষগুলোর মুখে আহার তুলে দিতে বেশ কিছু সংস্থাকে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে।

সুনামগঞ্জের বাসিন্দা বকুলা বেগম প্রায় সাত বছর ধরে পরিবার নিয়ে এই বস্তিতে থাকেন। আগুনে তার দুটি ঘর পুড়ে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দুইটা রুমে ৯ জন মানুষ থাকতাম। পুলিশের অভিযানের পর ভাবছিলাম ঈদের পরে এই জায়গা ছাড়মু। আমরা গরিব মানুষ, ঈদের সময় বাসায় বাসায় গিয়ে মাংস টুকাই। ওই মাংস দিয়া দুই দিন ভালোভাবে খাই। এবার তো সব শেষ। মাংস আইনা রান্না করমু কই? মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই। এবারের ঈদ আমাগো আসমানের নিচে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মো. নবাব জানান, তার ১৫টি ঘর ও একটি মুদি দোকান পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, এই শহরে ২০ বছর ধইরা যা কামাইছি, সব এক আগুনে শেষ। দোকানে কয়েক লাখ টাকার মাল ছিল, সব পুড়ে গেছে। কতো কষ্ট কইরা ঘর তুলছিলাম, আজ কিছুই নাই

কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা শাহীন আলম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পাঁচ বছর ধরে এই বস্তিতে ভাড়া থাকেন। ভাঙারির দোকানে কাজ করে সংসার চালানো শাহীন সমিতি থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে ঈদের পর একটি রিকশা কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু আগুনে ঘরের মালামালের সঙ্গে তার ৪২ হাজার টাকাও পুড়ে গেছে।

তিনি বলেন, ভাবছিলাম ঈদের পরে একটা রিকশা কিনমু, আর ভাঙারির দোকানে কাজ করমু না। এই জন্য কিস্তি থেকে টাকা তুলছিলাম। কিন্তু আগুনে সব শেষ। সামনে ঈদ, বউ-পোলা লইয়া কোথায় দাঁড়ামু জানি না। মানুষ ঈদ পালন করবো আর আমরা কোথায় থাকমু এই চিন্তায় ঘুমাইতে হইবো।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বস্তির বাসিন্দারা পোড়া ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। কেউ পোড়া টিন, কেউ ঘরের ভাঙা সরঞ্জাম বের করছেন। পরে সেগুলো ভাঙারির দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব সংগ্রহ করতে বিভিন্ন ভ্যান, অটোরিকশা ও মিনি ট্রাককে বস্তিতে ঢুকতে দেখা যায়।