রাজধানীর পল্লবীতে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার আট বছর বয়সী এক শিশুর বাবার আকুল আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে শাহবাগের চারপাশ। সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘আমি তো একজন ধর্ষিতার বাবা। খণ্ডিত লাশের বাবা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। আপনারা আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দেন, সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন।’
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর শাহবাগের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে এভাবেই নিজের বুকফাটা আর্তনাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল।
মেয়ে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ভুক্তভোগী এই পিতা। তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণায় তিনি জানতে চান, এই নির্মম ঘটনার দায় আসলে কার। খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া তার আদরের খুকু সোনার এই পরিণতির জন্য কি তার নিজের অবহেলা দায়ী, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলা দায়ী—সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও পরিবারটিতে এখনো স্বাভাবিকতা ফেরেনি। পৈশাচিক সেই ঘটনার পর থেকে নিহতের মা তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী বলছেন, তার কোনো ঠিক নেই। প্রতিনিয়ত তাকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে এবং তিনি আদৌ কখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন তার স্বামী।
নিরাপত্তাহীনতার এই চাদর শুধু সেই পরিবারটিকেই নয়, গ্রাস করেছে পুরো সমাজকে। ভুক্তভোগী বাবা তার বড় মেয়েসহ দেশের সকল শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, গত শুক্রবার তাদের বাড়িতে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু এসেছিল। এই অবুঝ শিশুটি ইতিমধ্যেই ‘ধর্ষণ’ শব্দটির ভয়াবহতার সাথে পরিচিত হয়ে গেছে, যা এই বয়সে তার কোনোভাবেই জানার কথা ছিল না। মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্কের কারণে সেই শিশুটি এখন একা টয়লেটেও যেতে পারছে না, সার্বক্ষণিক মায়ের আঁচল ধরে রাখছে। এটাই এখন বাংলাদেশের শিশুদের বাস্তব মানসিক অবস্থা। এই অবর্ণনীয় পরিস্থিতির অবসান চেয়ে তিনি এমন একটি সমাজব্যবস্থা দাবি করেন, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না এবং কাউকে সারা জীবনের জন্য ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে না।
উদ্বেগজনক এই গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্টরা দেশের সমসাময়িক শিশু নির্যাতন ও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই দিন দিন অপরাধের মাত্রা এমন নৃশংস পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ জরুরি। বক্তারা অনতিবিলম্বে পল্লবীর এই লোমহর্ষক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়।
বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান এবং আইনজীবী রাশনা ইমাম উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত পেশ করেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম।