রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।
বুধবার (২০ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্য শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে সমাহিত করা হয়।
কান্নায় ভেঙে পড়লেন স্বজনরা, এলাকায় শোকের ছায়া
এর আগে, বুধবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রামিসার মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। লাশ পৌঁছামাত্রই সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্না আর আহাজারিতে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জানাজায় রামিসার আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
নিহত রামিসা আক্তার সিরাজদিখানের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের মরহুম হেলাল উদ্দিন মোল্লার ছেলে হান্নান মোল্লার মেয়ে। সে ঢাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
আদালতে দোষ স্বীকার মূল আসামি সোহেল রানার
রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি সোহেল রানা বুধবার দুপুরে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। একই মামলার অপর আসামি ও সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আসামিদের আদালতে হাজির করেন। আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে তা রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত আসামি স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় সোহেল রানাকে আদালতে তোলা হলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যেভাবে চালানো হয় এই পাশবিক হত্যাকাণ্ড
পুলিশের আদালতে দেওয়া আবেদন ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়:
নিখোঁজ ও তল্লাশি: গত সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হয়। সাড়ে ১০টার দিকে তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
মরদেহ উদ্ধার: একপর্যায়ে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান স্বজনরা। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকেন তারা। সেখানে ফ্ল্যাটের ভেতর শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
আসামি গ্রেপ্তার: ঘটনাস্থল থেকেই স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হলেও, ঘরের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুটিকে যখন ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে তৃতীয় আরও এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। স্বজনরা দরজা ভেঙে ঢোকার আগেই তিনি কৌশলে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
খুনিদের ফাঁসির দাবিতে মশাল মিছিল
এই জঘন্য ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী। এদিকে, রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার ও জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে মুন্সিগঞ্জ শহরে মশাল জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।