ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক দিন ধরে পানিবন্দী। কোমর থেকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন মানুষ।
শুক্রবার (১১ জুলাই) বিকেলে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের আসহাব উদ্দিন সড়ক থেকে মোশাররফ আলী সড়ক পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও কোমরসমান, কোথাও হাঁটুপানি জমে রয়েছে। অনেক পরিবার এখনো ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা স্বজনদের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা গৃহবধূ ইসমত আরা আট বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ তামিমকে নিয়ে সাত কিলোমিটার দূরের গুনাগুরি এলাকায় এক স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, ঘরে কোমরসমান পানি ওঠায় সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এর আগেই তার স্বামী বৃদ্ধ মাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছেন। রান্না ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দেওয়ায় তিনিও সন্তানকে নিয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি ঢলের পানি কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও উপকূলঘেঁষা ইউনিয়নগুলোতে এখনো জলাবদ্ধতা কাটেনি। ফলে অধিকাংশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করছেন। তবে ঘরের মালামাল রক্ষার জন্য অনেক পুরুষ সদস্য বাড়িতেই থেকে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনা খাবার ও নিরাপদ পানির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গত শুক্রবার বাহারছড়া ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এক শিশুকে দাফনের জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পেতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। পরে একটি উঁচু পুকুরপাড়ে তাকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রবিউল হোসেন বলেন, স্ত্রী ও সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠালেও ৮০ বছর বয়সী বাবাকে সরানো সম্ভব হয়নি। তাই বাবাকে নিয়ে এখনো পানিবন্দী ঘরেই অবস্থান করছেন তিনি।
পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে নয়টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নেওয়া মছুদা খাতুন বলেন, "বৃহস্পতিবার রাত থেকে সেখানে থাকলেও এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। সুপেয় পানির সংকট সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
স্থানীয় বাসিন্দা নুরল আলম বলেন, "পানীয় পানি সংগ্রহ করতে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হচ্ছে। আবার বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানিই ভরসা।"
চাপাছড়ি মজিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ দিদার জানান, "বন্যার কারণে এলাকায় জুমার নামাজও মসজিদে আদায় করা সম্ভব হয়নি। আশ্রয়কেন্দ্রের নিচেও দুই থেকে তিন ফুট পানি জমে রয়েছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শুকনা খাবার দিলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।"
এদিকে জয় জলদাশ জানান, "তাদের বাড়ির ১৪টি পরিবার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শুকনা খাবার থাকলেও সুপেয় পানির অভাবে দুর্ভোগ বাড়ছে। একই এলাকার সোনা দাশ বলেন, ঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় একটি দোকানে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে।"
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, "ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রশাসন কাজ করছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল এবং আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।"