মা, দোয়া করিও, আমরা ফিরব’ সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে মাকে এ কথাই বলেছিলেন তামজিদ ও তাহমিদ। ছয় মাস পর ছোট ছেলে তাহমিদ দেশে ফিরেছেন। কিন্তু বড় ছেলে তামজিদ এখনো মিয়ানমারের কারাগারে। ছেলের ফেরার অপেক্ষায় প্রতিদিন পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন মা কোহিনূর বেগম।
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা এলাকার কোহিনূর বেগমের মতো রামগতি ও কমলনগরের আরও আটটি জেলে পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। উপার্জনক্ষম মানুষগুলো মিয়ানমারে বন্দি থাকায় পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট। অনেকের ঘরে খাবারের অভাব, কেউ আবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
কোহিনূর বেগম জানান, গত রোজার ঈদের পরদিন দুই ছেলে সাগরে মাছ ধরতে যান। পরে কক্সবাজার সীমান্ত এলাকা থেকে তাদেরসহ ১০ জনকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে। ধারদেনা করে ছোট ছেলে তাহমিদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলেও বড় ছেলে তামজিদ এখনো বন্দি। ছয়-সাত মাস ধরে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি দেশে ফেরা তাহমিদ জানান, সাগরে মাছ ধরার সময় তারা ঝড়ের কবলে পড়েন। ঝড়ের কারণে পথ হারিয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়লে মিয়ানমারের বাহিনী তাঁদের আটক করে। বয়স কম হওয়ায় তাঁকে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির জিম্মায় দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে ফেরেন তিনি। তবে তাঁর ভাইসহ অন্য জেলেরা এখনো মিয়ানমারে বন্দি রয়েছেন।
তাহমিদের ফিরে আসায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও তামজিদের জন্য উৎকণ্ঠা কাটেনি কোহিনূর বেগমের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছয় মাস পর এক ছেলে ফিরেছে, আরেক ছেলে এখনো ফেরেনি। এখন শুধু পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার বুকের মানিককে ঘরে ফিরিয়ে দিন।’
জেলে জাবের হোসেনের স্ত্রী রাশেদা বেগমের অবস্থাও একই। তিন সন্তান নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। সংসারের খরচ চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হচ্ছে তাঁকে। সন্তানরা প্রতিদিন বাবার কথা জানতে চাইলেও তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো উত্তর নেই তাঁর কাছে।
রাশেদা বেগম বলেন, ‘সাত মাস ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। একবেলা খেলে আরেক বেলা খাবারের চিন্তা করতে হয়। সরকারের কাছে মিনতি, আমার স্বামীকে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিন।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি ট্রলারে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ১৬ জন জেলে মহেশখালীর হোয়ানক থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। পরদিন থেকেই তাঁদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ২৮ মার্চ মহেশখালী থানায় ট্রলারটির মালিক মিজানুর রহমান একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
মিয়ানমারে বন্দি লক্ষ্মীপুরের জেলেরা হলেন, মো. জুয়েল, ফরহাদ হোসেন, মো. নিরব, মো. রাকিব হোসেন, সাদ্দাম হোসেন, মো. মেজবাহ উদ্দিন, মো. তামজিদ, মো. লিটন এবং কমলনগরের মো. অজি উল্যাহ।
বন্দি জেলেদের পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে স্বজনদের কোনো খোঁজ না থাকায় তাঁরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। একই সঙ্গে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা বন্দি থাকায় পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁরা দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, বন্দি জেলেদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গেও আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।