চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ ঠেকাতে বসানো হচ্ছে ক্যামেরা

বারবার সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। এতে যাত্রীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ট্রেনের জানালার কাচ ও রেলওয়ের সম্পদ। এমন পরিস্থিতিতে পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে এই রুটে পাথর নিক্ষেপের ৫০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে রামু, ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া ও হারবাং এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। দিন কিংবা রাতে চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে ছোড়া পাথরে জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীরা আহত হচ্ছেন।

পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত ও এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের ওয়াশপিটে রাখা পর্যটক এক্সপ্রেসের একটি বগির দুই পাশে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

কক্সবাজারে নিয়মিত যাতায়াত করেন যাত্রী শাহিদুল আলম। তিনি বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে এখন ভয়ে ভয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাঁর পাশের এক যাত্রীর চোখ পাথরের আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রেনে ভ্রমণের সময় আতঙ্ক বেশি কাজ করে।

শাহিদুল আলমের ভাষ্য, কক্সবাজারে যাওয়ার সময় আনন্দ থাকলেও ফেরার পথে সুস্থভাবে বাড়ি পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আরেক যাত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, রেলপথে ভ্রমণের অন্যতম প্রত্যাশা নিরাপত্তা। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা যাত্রীদের মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। এসি কিংবা নন-এসি—যেকোনো বগিতে জানালার পাশে বসা যাত্রী পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হতে পারেন। মাথায় পাথর লাগলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

ফরহাদ হোসেন মনে করেন, শুধু প্রশাসন বা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এ সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। যারা পাথর নিক্ষেপ করেন, তাঁদের এ বিপজ্জনক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

যাত্রী হোসাইন ইব্রাহীম বলেন, রাতে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় বড় দুর্ঘটনা, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এতে যাত্রীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদেরও ক্ষতি হয়। সরকারি সম্পদের ক্ষতি মানে জনগণেরই ক্ষতি। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে নিয়মিত যাতায়াত করেন জাহেদুল হক। তাঁর মতে, বিশেষ করে অন্ধকারে পাথর নিক্ষেপের আশঙ্কা যাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে। প্রতিটি ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের ওয়াশপিট সুপারভাইজার চয়ন রায় বলেন, ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর পর ওয়াশপিটে নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। কোনো জানালার কাচ ভাঙা থাকলে মজুত সাপেক্ষে তা পরিবর্তন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ কাজ ঢাকায় গিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। প্রতিটি কাচ পরিবর্তনের হিসাবও সংরক্ষণ করা হয়।

চয়ন রায় জানান, দুর্বৃত্তদের পাথর নিক্ষেপে ট্রেনের জানালার কাচ প্রায়ই ভেঙে যেত। তবে পর্যটক এক্সপ্রেসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পর গত এক সপ্তাহে কাচ ভাঙার কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি।

তাঁর মতে, সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হলে পাথর নিক্ষেপ ও জানালার কাচ ভাঙার ঘটনা কমে আসতে পারে।

কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী অন্য ট্রেনগুলোতেও ক্যামেরা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, একটি ট্রেনে ক্যামেরা বসিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পুরো রেলপথে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

কক্সবাজার এক্সপ্রেসের স্টুয়ার্ড ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম তুহিন বলেন, রামু, ইসলামাবাদ ও ডুলাহাজারার মধ্যবর্তী কয়েকটি স্থানে তাঁদের ট্রেন পাথর নিক্ষেপের শিকার হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তাঁদের ট্রেনেরও বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। অনেক সময় ট্রেনের কর্মীরা আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ের সঙ্গে বোঝা যাবে। তবে এ সমস্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রীরা আহত হচ্ছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেলওয়ের সম্পদ। এ সমস্যা প্রতিরোধে পর্যটক এক্সপ্রেসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

মেহেদী হাসান আরও বলেন, বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে পাথর নিক্ষেপের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হয়। কিন্তু শুধু প্রচার-প্রচারণায় এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাই ক্যামেরার মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্য ট্রেনেও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া এবং ঢাকা থেকে দুই জোড়া ট্রেনে প্রতিদিন কক্সবাজার রুটে যাতায়াত করেন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা রেলওয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের সচেতনতামূলক প্রচারণায় প্রত্যাশিত ফল না আসায় পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।