সাগরের বুকে জেগে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র নিঝুম দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত এ দ্বীপটি ভেসে ওঠার পর ৮০’র দশকে বন বিভাগ এখানে বনায়ন করে। এরপর সরকার এই দ্বীপে মাত্র দুই জোড়া হরিণ অবমুক্ত করলে পরবর্তীতে হরিণের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ২০০১ সালে সরকার নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ও হরিণের অভয়ারণ্যের ঘোষণা করলেও দিন দিন হরিণের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বন উজার, জনবসতি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বনদস্যুর আক্রমণসহ বিপরীত পরিস্থিতির কারণে হরিণ সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের।
দ্বীপটিতে হরিণের সংখ্যা নিয়ে জাহাজমারা রেঞ্জ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে বনবিভাগ নিঝুম দ্বীপ অংশের বনে দুই জোড়া চিত্রা হরিণ ছাড়ে। পরবর্তীতে যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। কিন্তু জাতীয় উদ্যান এলাকায় দিন দিন মানুষের বসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। এছাড়া নিঝুম দ্বীপে কুকুর-শিয়ালের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক সময় কুকুর-শিয়ালের আক্রমণে হরিণ হতাহতের ঘটনা ঘটে। উপযুক্ত খাদ্য বা পরিবেশ না থাকায় বিভিন্ন সময়ে জাতীয় উদ্যানের অন্যান্য চরে ছড়িয়ে যেতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, ১৯৯৬ সালে হরিণ শুমারি অনুযায়ী এখানে হরিণের সংখ্যা ছিল প্রায় ২২ হাজারের মতো। যা এখন গল্পের মতো শোনায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিঝুম দ্বীপের অভ্যন্তরে খালসমূহ দিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকা-ট্রলার চলাচল, সীবিচ এরিয়ায় লাইটহাউজ স্থাপন, ভূমি লোভী, জেলে ও নতুন নতুন বসতিদের দ্বারা বন উজাড়সহ নানান বিপরীত পরিস্থিতির কারণে এ মায়াবী হরিণ কমে গেছে। এছাড়া হরিণের জন্য সুপেয় পানি ও নিরাপত্তার জন্য নির্মিত পুকুরসমূহের উঁচু পাড় ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময় বন্যায় ভেঙে গেছে। এতে হরিণের সুপেয় পানি ও নিরাপত্তার সংকট দেখা দিয়েছে। তাই পুকুরসমূহের সংস্কারের জোর দাবি করেন এলাকাবাসী।
নিঝুম দ্বীপে হরিণের সংখ্যা সংক্রান্তে সেখানকার এক সমাজ কর্মীর দুলাল উদ্দিন বলেন, হরিণ এখন সোনার হরিণ হয়ে গেছে! গেল ৩-৪ বছর আগেও এখানকার বিভিন্ন বাগানে ঢুকলেই হরিণ দেখা যেতো। এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেও হরিণের দেখা মিলে না। এর কারণ হিসেবে নিঝুম দ্বীপে জনবসতি বৃদ্ধিসহ নানান বৈরী পরিস্থিতিকে দায়ী করলেন তিনি।
স্থানীয় এক মেম্বার চানমিয়া জানান, নিঝুম দ্বীপ এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিমের চরে প্রচুর মহিষ বিচরণ করে ফলে হরিণ একদিকে ঘাস পায় না অন্যদিকে গাছের পাতাও তেমন পায় না। এসব কারণেও হরিণ কমে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
জাহাজমারা বন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, নিঝুম দ্বীপ বনাঞ্চলে হরিণের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য শোনা গেলেও সরকারিভাবে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে স্থানীয়ভাবে তথ্য প্রকাশের নজির আছে।
তিনি জানান, অতীতে হরিণ নিধন ও পাচারের ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে তা নেই। জাতীয় উদ্যান এলাকার বিভিন্ন চরে নতুন নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃজনের মাধ্যমে হরিণের খাদ্য ও উপযুক্ত বাসস্থানের পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। চলতি বছর মার্চ 'জাতীয় উদ্যান' এলাকায় ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।