বাংলাদেশের পার্বত্য জনপদ রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা চালাচ্ছেন। সরকারি হিসেবে জেলার ৫৯ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এলেও বাস্তবে গ্রীষ্ম ও শুকনো মৌসুমে সেই সুবিধা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বছরের অর্ধেক সময় তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন।
সরেজমিনে রাঙামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম নাড়াইছড়ি গ্রামে দেখা যায়, গ্রামের ১১৩টি পরিবার একমাত্র পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। শীতের শেষদিকে ছড়ার পানি শুকিয়ে যেতে শুরু করে এবং গ্রীষ্মে একেবারে শুকিয়ে যায়। তখন গ্রামের মানুষ মাটিতে গর্ত খুঁড়ে ছোট কুয়া তৈরি করে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করেন।
নাড়াইছড়ি গ্রামের বাসিন্দা সুবিমল চাকমা বলেন, শীত শেষে পানির সঙ্কট শুরু হয়, গ্রীষ্মে ছড়ায় পানি থাকে না। তখন মাটি খুঁড়ে পানি তুলতে হয়।
আরেক বাসিন্দা জোনাকি চাকমা জানান, সারাদিন মাঠে কাজ করার পর গোসল করার মতো পানি থাকে না। খাবার পানির জন্য অনেক দূর পায়ে হেঁটে যেতে হয়।
গ্রামের কার্বারি (প্রধান) খুলমোহন কার্বারি বলেন, প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে পুরো গ্রাম পানির জন্য হাহাকার করে। ছড়ার পানি পান করে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাটের সমস্যার কারণে অসুস্থদের হাসপাতালে নিতেও কষ্ট হয়। আমরা সরকারের কাছে নিরাপদ পানির দাবি জানাই।
গ্রামের বাসিন্দা জ্যোর্তিময় চাকমা বলেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে। আমাদের ছোটবেলায় চারপাশে গাছপালা ছিল। এখন গাছ কেটে ফেলার কারণে প্রাকৃতিক পানি উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে পানি সংকট ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে ৫৮.৪৭ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে। বাকিদের জন্য সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ চলছে। কমিউনিটি বেইজড পাইপ নেটওয়ার্ক সাপ্লাই স্কিম এবং রুরাল পাইপ নেটওয়ার্ক সাপ্লাই স্কিম চালু আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য শুধু নতুন প্রকল্প নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও জরুরি। পাহাড়ি এলাকায় বৃক্ষরোপণ, প্রাকৃতিক ছড়া ও জলাশয় রক্ষা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করতে হবে।
এলাকাবাসী আশা করছেন, সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদের মানুষরা একদিন সুপেয় পানির নিরাপত্তা পাবেন এবং তাদের কষ্ট লাঘব হবে। এখন সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে আর কোনো পাহাড়ি পরিবারকে পানি সঙ্কটে হাহাকার করতে না হয়।