কক্সবাজারে দায়িত্বরত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১৫ এর সিওসহ প্রায় সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হঠাৎ করে একযোগে প্রত্যাহার করেছে সদর দপ্তর। কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে সংযুক্ত করা হয়েছে হেড কোয়ার্টারে। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কামরুল হাসান কমান্ডার বিএন এর অনুমোদিত মেজর ফয়সাল আহমেদ (উপপরিচালক প্রশাসন) স্বাক্ষরিত গত ১৯ নভেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ সদস্যকে এবং একই তারিখে আরেক প্রজ্ঞাপনে ২০০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়। গত ১২ নভেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ৬২ জনকে বদলি করা হয়। ১৭ নভেম্বর মেজর ফয়সাল আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ১০০ জন সদস্যকে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়। এছাড়াও গতকাল ২৭ নভেম্বর আরও ৭৪ জন র্যাব সদস্যকে বদলি করা হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র জানায়, র্যাবের কথিত সিভিল টি এফএস সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের ইয়াবা কাণ্ডসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে আসছিল। র্যাবের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে আদায় করছিল মোটা অঙ্কের মাসোহারা।
সূত্র জানায়, র্যাবের প্রতিটি কর্মকর্তাই নিজস্ব এফএস (ফিল্ড স্টাফ) থাকে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার মত এরা সিভিল টিম হিসেবে কাজ করে তথ্য সরবরাহ করে। কক্সবাজারে কথিত এই সিভিল টিমই ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অপরাধী সহায়তা করে বিনিময় আদায় করে ভাগ বাটোয়ারা। এ ধরনের সুদৃশ্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রত্যাহার করা হয়েছে কক্সবাজার র্যাবের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে। তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে র্যাব সদর দপ্তরে। একই সঙ্গে বদলি করা হয়েছে বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা টু আইসিসহ সব কর্মকর্তাদের।
র্যাব সদর দপ্তরের পাঁচটি পৃথক কোয়ার্টারে দেখা যায়, কর্মরত বাবুর্চি, সুইপার, সুবেদার, হাবিলদার, এসআই, নায়েক, কর্পোরাল, এএসআই, কনস্টেবল, সিপাহী, সৈনিকসহ বিভিন্ন পদের ৬৩৪ জনের বদলির আদেশ জারি হয়েছে। তিন শতাধিক র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করে অন্যান্য ইউনিটে কর্মরতদের কক্সবাজার বদলি করা হয়েছে। তিন শতাধিক সদস্যকে কক্সবাজার থেকে অন্যান্য ইউনিটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, কক্সবাজার ইউনিট থেকে বাবুর্চি সুইপারসহ প্রায় সবাইকেই অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, কথিত সিভিল টিমের কর্পোরাল ইমাম ও লুৎফর সরাসরি সিও এর সঙ্গে কাজ করতেন। তাদের বড় বড় চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও কর্মকর্তা এহেতেশাম ও নাজমুলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজার ও র্যাব সদর দপ্তরে বিষয়টি বেশ আলোচিত।
র্যাব সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের পরিচালক, বাংলাদেশ পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় গুম, ক্রসফায়ার, দখলবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাও দেয়। কক্সবাজারের আলোচিত কাউন্সিলর একরামুল হত্যাকাণ্ডের পর র্যাবকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
কক্সবাজার র্যাবের সিও ক্লোজড ও সদস্য প্রত্যাহারের বিষয়ে র্যাব সদর দপ্তরের মিডিয়া উইং এর পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেকাব চৌধুরী বলেন, প্রত্যাহার করা কমান্ডিং অফিসার এক বছরের বেশি কক্সবাজারে কর্মরত ছিলেন। তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত কয়েকদিনে ৩ শতাধিক কর্মকর্তা ও সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে এটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জানা নেই, খোঁজ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কর্মরত সব র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়নি। বিষয়টি সদর দপ্তরের অপারেশন শাখা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
র্যাব সদস্যদের ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয় জড়িত থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র্যাব অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।
কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় র্যাবের অপারেশন কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীদের নানা সন্দেহ সংশয় রয়েছে। সর্বশেষ গত কয়েকদিন আগে কুতুবপালং র্যাব ক্যাম্পের কর্মকর্তা পুলিশের ৩০ ব্যাচের কামরুজ্জামান এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নগদ ৬০ লাখ টাকা ও ৪ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট আটকের পর ভাগ বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। র্যাবের প্রতিটি কর্মকর্তা এফএস নিয়োগ করে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, যাদের দায়িত্ব এলিট ফোর্স হিসেবে নিষিদ্ধ অবৈধ মাদক নিয়ন্ত্রণসহ অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা, তারা নিজেরাই যখন মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েন তখন রাষ্ট্র অসহায় হয়ে যায়। র্যাব হেডকোয়ার্টার যদি শুধুমাত্র একযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করেই ক্ষান্ত হয় তাহলে আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। তাই তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের কিছুই হবে না। ইমেজ সংকটে থাকা এলিট ফোর্সের ভাবমূর্তি ধরে রাখা খুবই জরুরি বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল এসব স্থানে পদায়নের আগে তাদের যথাযথ ট্রেনিং ব্রিফিং দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, দেশের সমুদ্র ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জেলা কক্সবাজারের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১৫ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। অন্যান্য ব্যাটালিয়ন কয়েকটি জেলার দায়িত্বে থাকলেও শুধুমাত্র কক্সবাজারের জন্য একটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন ছিল। বিগত সরকারের সময় গুম, ক্রসফায়ার, চাঁদাবাজি, দখলবাজির কারণে কক্সবাজারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যাপক নিন্দা হয়। বিশেষ করে আটক এক কাউন্সিলর একরামুল হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত আলোচিত। কক্সবাজার র্যাব সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন করছে। কিছুদিন আগে এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে গোপন বাণিজ্যের অভিযোগে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের কক্সবাজার সিওকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। কক্সবাজারে মোতায়েন করা প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যই পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে দায়িত্ব পালনে লোভ লালসা ও ঝুঁকির মুখোমুখি।