কাঁচি-চিরুনিই প্রতুলের জীবনের সঙ্গী

কাপাসিয়া বাজারের ব্যস্ততার মধ্যে প্রতিদিনই দেখা মেলে ৭০ বছর বয়সী এক প্রবীণ কারিগরের। সামনে সাজানো কাঁচি, চিরুনি ও শেভিংয়ের সরঞ্জাম। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়েছে, আগের মতো শক্তি নেই হাতে। তবুও সকাল হলেই নিজের ছোট্ট কর্মস্থলে এসে বসেন প্রতুল শীল। মানুষের চুল-দাড়ি কাটতে কাটতে জীবনের ৫৫টি বছর পার করে দিয়েছেন তিনি।

গাজীপুরের কাপাসিয়া বাজারের এই প্রবীণ নরসুন্দর প্রতুল শীলের জীবনের গল্প মূলত সংগ্রাম আর দায়িত্বের গল্প। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের প্রয়োজনে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কাঁচি-চিরুনি। তখন তাঁর বয়সী অন্যরা যখন খেলাধুলা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত, প্রতুল তখন জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়েন।

প্রতুল শীল বলেন, ‘১৩ বছর বয়সেই এই কাজ শুরু করি। ছোট থাকতেই বাবা মারা যান। বড় ভাই আমাকে লালন-পালন করেছেন। পরে পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে হয়। সেই থেকেই এই পেশায়।’

তবে তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা কাপাসিয়া বাজারে হয়নি। কাঁচি-চিরুনি হাতে নিয়ে একসময় বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষের চুল কাটতেন তিনি। কোনো বাড়িতে মিলত সামান্য পারিশ্রমিক, কোথাও আবার খাবার দিয়েই বিদায় করা হতো। সেই আয় আর পাওয়া খাবারেই চলত তাঁর দিন।

সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়ে, পেশাটিও হয়ে ওঠে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একপর্যায়ে কাপাসিয়া বাজারে স্থায়ীভাবে বসার সুযোগ পান প্রতুল। এরপর থেকে একই বাজারে টানা পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের চুল ও দাড়ি কাটছেন তিনি।

বয়স বাড়লেও তার দোকানের সেবার মূল্য এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই। শেভ করতে নেন মাত্র ২০ টাকা। চুল কাটার পারিশ্রমিক ৪০ থেকে ৫০ টাকা। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো তাঁর জন্য সহজ নয়।

প্রতুল বলেন, ‘শেভ করি ২০ টাকায়, চুল কাটার জন্য নিই ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এই আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হয়।’

প্রতিদিন তাঁর কাছে কতজন মানুষ চুল কাটাতে আসেন, তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। কোনো দিন ব্যস্ততা থাকে, আবার কোনো দিন দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়। বয়সের কারণে আগের মতো টানা কাজ করাও সম্ভব হয় না। তারপরও দোকানে বসতে হয়, কারণ এই পেশাটিই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

শুধু কাঁচি চালানোর কাজ নয়, প্রতুলের পাঁচ দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাপাসিয়া বাজারের অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। তাঁর সামনে বসে চুল কেটেছেন একটি প্রজন্মের মানুষ। তাঁদের অনেকের সন্তানও পরে বাবার হাত ধরে এসে প্রতুলের দোকানে চুল কাটিয়েছে।

যাদের একসময় ছোট্ট শিশু হিসেবে সামনে বসিয়ে চুল কেটেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন বৃদ্ধ। কেউ কেউ আবার পৃথিবী ছেড়েও চলে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখগুলোর স্মৃতি এখনো প্রতুলের মনে গেঁথে আছে।

একটি কাঁচি, একটি চিরুনি আর কয়েকটি সাধারণ সরঞ্জামই তার জীবনের নীরব সঙ্গী। এসব দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মিটিয়েছেন, সন্তানদের বড় করেছেন এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা পার করেছেন। প্রতুলের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁদের মানুষ করতে জীবনের সেরা সময়টুকু ব্যয় করেছেন তিনি।

বড় কোনো স্বপ্ন বা বিলাসী জীবনের আকাঙ্ক্ষা কখনো ছিল না তার। সামান্য আয়, নিজের কাজ আর পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখাই ছিল তাঁর কাছে জীবনের বড় প্রাপ্তি।

এখন বয়স ৭০। শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। কখনো হাতে কাঁপুনি আসে, চোখেও আগের সেই তীক্ষ্ণতা নেই। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই দোকানে বসতে হয়। অবসরের কথা ভাবার সুযোগ থাকলেও বাস্তবতা সে সুযোগ দেয় না।

এর মধ্যে বদলে গেছে কাপাসিয়া বাজারও। সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আধুনিক সাজসজ্জার নানা সেলুন। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আধুনিক সেবা ও নতুন ধরনের হেয়ারস্টাইলের দিকে ঝুঁকেছেন। তবুও প্রতুল শীলের মতো পুরোনো কারিগররা এখনো তাঁদের দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের পরিচিতির ওপর ভর করে টিকে আছেন।

আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় বাড়েনি তার। কিন্তু পেশার প্রতি টান আর জীবিকার প্রয়োজন তাঁকে এখনো প্রতিদিন দোকানে নিয়ে আসে। বছরের পর বছর মানুষের চুল-দাড়ি কাটার বিনিময়ে পাওয়া সামান্য অর্থেই চলে তাঁর সংসার।

প্রতুল শীলের জীবন তাই শুধু একজন নরসুন্দরের কর্মজীবনের গল্প নয়, এটি দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম আর প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার এক দীর্ঘ কাহিনি।

জানা গেছে, ১৩ বছর বয়সে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যে কিশোর কাঁচি হাতে নিয়েছিল, সাত দশক বয়সেও সেই কাঁচি পুরোপুরি নামিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। অন্যের চুল কাটতে কাটতে তার জীবনের ৫৫ বছরও যেন সময়ের কাঁচিতে কেটে গেছে।

তবুও প্রতুলের কথায় নেই কোনো বড় অভিযোগ। নেই বিলাসী জীবনের প্রত্যাশা। আছে শুধু কাজ করে যাওয়ার অভ্যাস।