জেলেদের কাছে ইলিশ যেন সোনার হরিণ

পদ্মা নদীতে ইলিশ মাছের আকাল চলছে। আগে যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ জালে আটকা পড়ত, সেখানে জালে এখন তেমন ইলিশ ধরা পড়ে না। ইলিশ এখন সোনার হরিণ জেলেদের কাছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার বাহিরচর এলাকার জেলেরা মাছ ধরতে নদীতে যাওয়ার অপেক্ষা করছেন।

তারা বলেন, একসময় প্রতি ফেলা জালে দুই থেকে তিন মণ করে ইলিশ পাওয়া যেত। জাল তুলতে কষ্ট হতো। অথচ এখন সারা দিনে খুবই কম ইলিশ পাওয়া যায়। ভাগ্যচক্রে সারা দিনে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ কেজি ইলিশ পাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ জেলে ৩-৪ কেজি করে ইলিশ পেয়ে থাকেন। অনেক জেলে খালি হাতে বাড়িতে আসেন। বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পদ্মার জেলেদের।

অপরদিকে বাজারে ইলিশের চড়া দাম। নিম্নবিত্তরা তো আগে থেকেই খেতে পারেন না ইলিশ, আবার এখন মধ্যবিত্তরের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে ইলিশ। খেতে মন চাইলেও মধ্যবিত্তদের ইলিশ খেতে গেলে ভাবতে হচ্ছে ১০ বার। 

তবে ক্রেতারা বলছেন, সুষ্ঠুভাবে বাজার তদারকি ও মনিটরিং করলে কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে ইলিশের দাম। যে মাছ চাষ করতে হয় না, কোন খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে যে মাছ বেড়ে ওঠে সেই মাছের ধরাছোঁয়ার বাইরে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

দৌলতদিয়া ইউনিয়নের এক জেলে বলেন, মাছ ধরা আমার বাপ-দাদার পেশা। বর্তমানে এ পেশা লাভজনক না হলেও ধরে রেখেছি জীবিকার তাগিদে। আমার মাছ ধরার বয়স ৩০ বছরের কম না। ১৯৯০ সালের পর থেকে এই দৌলতদিয়ার পদ্মায় মাছ শিকার করি। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি ১৯৮৮ সালের বন্যার পর পদ্মায় ইলিশের আকাল শুরু হয়েছে। এরপর থেকেই ইলিশের আর সোনালী দিন ফেরেনি। তারপরও এই পৈতৃক পেশা ধরে রেখেছি। কিন্তু আমি চাই না আমার সন্তান বা পরের প্রজন্ম এই পেশায় আসুক। অনেকেই এখন এই পেশা পরিবর্তন করেছে।

তিনি আরও বলেন, মাছ যা পাই তা বিক্রি করে আমার পোষায় না। পদ্মায় মাছ শিকারে গেলে ৫/৬ জনের কমে যাওয়া যায় না। সবার দিনের একটা হাজিরা আছে। নৌকার তেল খরচ, জালের খরচ, দাদনের টাকা ইত্যাদি মিলে অনেক খরচ। কিন্তু মাছ বিক্রি করে আমরা লাভ করতে পারছি না। আবার ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এই ২২ দিন কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।

রাজবাড়ী সদরের গোদার বাজার, সোনাকান্দর, উড়াকান্দা এলাকার কয়েকজন জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগামী ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষেধ থাকবে। আমরা ইলিশ সম্পদ রক্ষায় নদীতে নামবো না। কিন্তু বাইরের জেলেরা এসে ঠিকই মাছ মেরে নিয়ে যাবে। মৎস্য বিভাগসহ প্রশাসনকে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। নদীতে অভিযান চলাকালে দেখা যায়, যেদিকে অভিযান চলে তার উল্টো দিকে জেলেরা মাছ ধরে। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যক্তিদের আঁতাত থাকে। যারা অভিযানের তথ্য জেলেদের দিয়ে দেয়। এই বিষয়গুলো প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের মাছ ব্যবসায়ী মো. চান্দু মোল্লার চাঁদনী অ্যান্ড আরিফা মৎস্য আড়তে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির জন্য আড়ত থেকে শুক্রবার ভোরে বেশ কয়েকটি বড় সাইজের ইলিশ কিনেছেন তিনি। চান্দুর ভাষ্য- প্রতি কেজি ইলিশের ওজন ১ কেজির সামান্য বেশি। গড়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইলিশ কেনা হয়েছে। এগুলো বিক্রি করা হবে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা কেজি দরে। 

তিনি বলেন, দৌলতদিয়াতে তেমন পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায় না। গত বুধবার ২ হাজার ২০০ টাকা, বৃহস্পতিবার ২ হাজার ১০০ টাকা দরে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে। আড়তে ৩০ থেকে ৫০ কেজির মতো ইলিশ পাওয়া যায়। তারও দাবি কোনো কোনো জেলে ১০ কেজি, কেউ ২ কেজি ইলিশ নিয়ে আড়তে আসেন।

সরেজমিনে শুক্রবার (১১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজবাড়ী বড় বাজারের মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, খুচরা বাজারে ১ কেজি থেকে ১ কেজির বেশি সাইজের ইলিশ কেজি প্রতি ২৩০০ টাকা ২৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজির কিছু কম ওজনের ইলিশ ২১০০ থেকে ২৩০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৪০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা কেজি, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১০০০ থেকে ১৩০০ টাকা ও ২০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ মানভেদে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

একই বাজারে পাইকারদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১ কেজি থেকে ১ কেজির ওপরের সাইজের ইলিশ বাজারে ২০০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়েছে। ৮০০ থেকে ১ কেজির নিচের সাইজের ইলিশ ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা, ছোট সাইজের জাটকা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। তাদের দাবি, বাজারে বড় মাছের আমদানি কম থাকায় দাম বাড়তি রয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে সব সাইজের ইলিশে কেজি প্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। এছাড়াও আগামী ১৩ তারিখ থেকে ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বাজারে মাছের দাম বেশি।

রাজবাড়ী জেলার মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সদটলর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোস্তফা আল রাজীব বলেন, ইলিশ এখন তুলনামূলক কম পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ পদ্মায় ইলিশ আসতে পারে না। নদীতে বিভিন্ন স্থানে চর পড়েছে। ইলিশের যে মাইগ্রেটরি চ্যানেল ছিল, সেই চ্যানেল বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এখন ইলিশের আধিক্য কমে গেছে। কেন পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না, তার কারণ খুঁজে বের করতে আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি পদ্মায় ইলিশের সুদিন আসবে।