ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের পুরাতন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার ২১ বছর পার হলেও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটি দীর্ঘদিন আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও সেখানে নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ভবনটি ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ষাটের দশকে বারোবাজার-হাকিমপুর সড়কের পাশে বাজারের মধ্যেই দুই তলা বিশিষ্ট ওই ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবনের নিচতলায় ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো এবং দ্বিতীয় তলায় পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। ২০০৪ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদের সময়ে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে প্রশাসন সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।
এরপর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০০৫ সালে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের পরিবারের দান করা জমিতে বাদুরগাছা সড়কের পাশে নতুন আধুনিক ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ করে পরিষদের সব কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু পরিত্যক্ত ঘোষণার ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোনো ভবনটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ জামিরুল ইসলাম কোনো বৈধ বরাদ্দ বা অনুমতি ছাড়াই প্রায় ১৭ বছর ধরে ভবনের একটি অংশে পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ভবনের বাকি অংশও তার চাচাতো ভাইদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলেও জামিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি মাঝেমধ্যে কিছু অর্থ পরিশোধ করেন। তবে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ভবনটি ছেড়ে দিতে বলা হলেও তিনি তা মানছেন না। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভবন দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বারোবাজার ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও কালীগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসান সাজ্জাদ বলেন, ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে একটি আধুনিক মার্কেট নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দিয়ে সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে গ্রাম পুলিশ জামিরুল ইসলাম প্রায় ১৭ বছর ধরে সেখানে পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসা করছেন। তাকে একাধিকবার মৌখিকভাবে ভবন ছাড়তে বলা হয়েছে এবং কয়েক দফা লিখিত নোটিশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। সরেজমিনে ব্যবস্থা নিতে গেলে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বাধা দেন বলেও জানান তিনি।
বারোবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০০৪ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম অস্থায়ী কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০০৫ সালে আমাদের পরিবারের দান করা জমিতে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মিত হয়।
তিনি বলেন, পরিত্যক্ত ভবনের সামনে ও ভেতরে প্রতিদিন ব্যবসা-বাণিজ্য হওয়ায় মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত ভবনটি ঘিরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করে নিয়ম অনুযায়ী দোকান বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানাই। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি প্রভাব খাটিয়ে দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ বন্ধেরও আহ্বান জানাই।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ভবনটি নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা, চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং প্রবেশ নিষেধ সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি সেখানে একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।