দীর্ঘ তিন মাসের আইনি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আজ খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবনের দুয়ার। বন বিভাগের পক্ষ থেকে পাস (অনুমতিপত্র) দেওয়া শুরু হতেই উপকূলীয় এলাকায় দেখা দিয়েছে আগাম প্রস্তুতি ও ব্যস্ততা। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পর (১ সেপ্টেম্বর) বনজীবীরা নৌকার বহর নিয়ে বনে প্রবেশ করার কথা। এ ছাড়া তিন শতাধিক পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনে যাচ্ছে সাতটি পর্যটকবাহী জাহাজ।
মাছ ও বন্য প্রাণীর প্রজনন এবং নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এই বনে। মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় এ সময়ে বনে ফিরেছে তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ। সম্প্রতি ভোলা ও আলীবান্দা নদীর মোহনা দিয়ে সুন্দরবনের গহিনে প্রবেশ করে দেখা যায়, বনের চরে দল বেঁধে ঘাস খাচ্ছে হরিণ। ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলের আশপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে কাঁকড়া। দূর থেকে ভেসে আসছে নানা প্রজাতির পাখির ডাক। নদী-খালে জোয়ার-ভাটার টান, বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া সবুজ আর বন্য প্রাণীর বিচরণে সুন্দরবনের পরিবেশ হয়ে উঠেছে সজীব। খালের পাড়ে কুমিরকে রোদ পোহাতেও দেখা গেছে।
শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের জেলে লতিফ গাজী বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকায় মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। সামনে বন খুলছে ঠিকই, কিন্তু আসল ভয় বনদস্যুদের নিয়ে। বনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগেই আতঙ্কে রাত কাটছে, না জানি কখন ডাকাতের কবলে পড়তে হয়!
গাবুরা এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, আগে বনে ঢুকতে মূল ভয় ছিল বাঘের, আর এখন প্রধান আতঙ্ক বনদস্যু। গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে বন বিভাগের পাস নেওয়ার পাশাপাশি দস্যু বাহিনীকেও মাসিক চাঁদা দিয়ে বিশেষ 'স্লিপ' নিতে হয়। চাঁদা না দিলে জেলেদের জিম্মি করে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে বনদস্যু দমনে বিভিন্ন সময় আশ্বাসের কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্ধার অভিযান বা যৌথ তৎপরতা দেখা যায় না। এর সুযোগে ডাকাতদলের দৌরাত্ম্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে অসাধু চক্র বনের অভয়ারণ্যে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সুন্দরবন বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ইরফান হোসেন জানান, প্রজনন ও সংরক্ষণ মেয়াদের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়ম অনুযায়ী জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটকদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে বনাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বনজীবীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।