বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। সকাল, দুপুর কিংবা রাত ভাত ছাড়া যেন খাবারের তালিকাই পূর্ণ হয় না। কিন্তু এমন একজন কিশোরের সন্ধান মিলেছে, যে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত এক মুঠো ভাতও খায়নি। অবাক করা হলেও সত্য, ভাত না খেয়েই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে সে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অধ্যুষিত দুর্গম গ্রামের বেড়াবাড়ির কৃষক বুদ্দু মোল্লার ছেলে পারভেজ হাসান বাঁধনের বয়স এখন ১৭ বছর। দুই বোনের একমাত্র ভাই বাঁধন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এক ব্যতিক্রমী কিশোর হিসেবে। কারণ, গ্রামের সবাই জানে বাঁধন ভাত খায় না।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের পর অন্য শিশুদের মতোই সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল বাঁধন। কোনো ধরনের শারীরিক জটিলতা ছিল না। কিন্তু সমস্যা ধরা পড়ে তার ‘মুখে ভাত’ অনুষ্ঠানের সময়। প্রথমবার মুখে ভাত দেওয়ার চেষ্টা করতেই কান্নাকাটি শুরু করে সে। কিছুক্ষণ পর বমি করে ফেলে। এরপর কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও একই ঘটনা ঘটতে থাকে।
পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন বয়স বাড়লে হয়তো ভাত খেতে শুরু করবে। কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি। প্রায় দুই বছর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার পর আবারও ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। তখনও ভাত মুখে নিতেই অস্বীকৃতি জানায় বাঁধন। জোর করে খাওয়াতে গেলেই বমি করে দিত।
বাঁধনের মা জানান, ‘আমরা সবাই ভাত খাই, কিন্তু সে কখনো আমাদের সঙ্গে বসে ভাত খায় না। সকালে মুড়ি খায়, দুপুরে সবজি দিয়ে রুটি খায়, রাতে আবার মুড়ি খেয়ে থাকে। অনেক সময় মুড়ি না থাকলে না খেয়েও থাকতে হয়। ছোটবেলা থেকে এমনটাই দেখে আসছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কত ডাক্তার দেখিয়েছি, কবিরাজের কাছেও নিয়েছি। সবাই বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু কোনো চিকিৎসাতেই কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন আমরা ধরে নিয়েছি এটাই তার স্বাভাবিক অভ্যাস।’
বাঁধনের বাবা কৃষক বুদ্দু মোল্লা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ছেলের এই সমস্যা। শুকনো খাবার পছন্দ করে, কিন্তু ভেজা খাবার একদম সহ্য করতে পারে না। ভাতের গন্ধ বা ভাতের কাছে গেলেও অস্বস্তি বোধ করে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সবাই ভাত খায়, আর সে শুধু মাংস বা শুকনো খাবার খেয়ে নেয়।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভাত না খেলেও বাঁধন শারীরিকভাবে বেশ কর্মঠ। ছোটবেলা থেকেই বাবার কৃষিকাজে সহায়তা করে আসছে। পরিবারের কৃষিজমিতে নিয়মিত কাজ করে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে চলনবিল এলাকায় যখন বন্যার পানি বাড়ে, তখন পরিবারের শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রী পরিবহনের কাজেও অংশ নেয়।
প্রতিবেশী আব্দুল করিম বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, বাঁধন কখনো ভাত খায় না। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো। কিন্তু এখন সবাই জানে সে মুড়ি, রুটি আর শুকনো খাবার খেয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয়দের মতে, ভাত ছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছর পার করা বাঁধনের ঘটনা এলাকায় কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে এসে তাকে দেখতে চান এবং জানতে চান কীভাবে ভাত ছাড়া একজন মানুষ এতদিন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
তবে চিকিৎসকদের মতে, বিষয়টি খাদ্যাভ্যাসজনিত বিশেষ সমস্যা বা খাবার গ্রহণে মানসিক অনীহার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা সম্ভব।