সন্ধ্যা নামলেই একসময় বাংলার গ্রামগুলোতে যেন আরেকটি সন্ধ্যা নেমে আসত বেতারের শব্দে। চারদিকে নীরবতা ভেঙে ভেসে আসত পরিচিত কণ্ঠ, ‘বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা...’। সেই একটি বাক্যই যেন জানিয়ে দিত, দেশের খবর শুরু হচ্ছে। উঠানে পাটি পেতে, চায়ের দোকানের বেঞ্চে কিংবা বারান্দার মাদুরে বসে মানুষ কান পেতে থাকত ছোট্ট একটি ট্রানজিস্টরের দিকে। কৃষক, স্কুলশিক্ষক, দোকানি, ছাত্র, গৃহিণী—সবাই যেন একই অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়তেন।
আজ সেই ট্রানজিস্টরগুলো আর মানুষের হাতের মুঠোয় নেই। কোনোটি ঘরের কাঠের আলমারিতে ধুলোর স্তরে ঢেকে আছে, কোনোটি টিনের বাক্সে স্মৃতির নিদর্শন হয়ে পড়ে আছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী এই বেতারযন্ত্র যেন নিঃশব্দেই বিদায় নিচ্ছে মানুষের জীবন থেকে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দৌলত মাস্টারের বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। বাড়ির একটি কাঠের আলমারি খুলে তিনি যত্ন করে বের করেন প্রায় চার দশকের পুরোনো একটি ট্রানজিস্টর। কালচে হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক, বিবর্ণ ডায়াল, মরিচা ধরা অ্যান্টেনা—সবই সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু তাঁর কাছে এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, জীবনের অমূল্য স্মৃতি।
ট্রানজিস্টরটি হাতে নিয়ে আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই রেডিও শুধু একটা যন্ত্র নয়, এটা আমার জীবনের সঙ্গী। স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছি, যুদ্ধের খবর শুনেছি, অসংখ্য ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনেছি। কত রাত যে এই রেডিওর পাশে কাটিয়েছি, তার হিসাব নেই। এখন সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু রেডিওর শব্দে যে মায়া ছিল, সেটা আর কোথাও পাই না।’
বিদ্যুৎহীন বাংলার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী
আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, এমন একটি সময় ছিল যখন একটি ব্যাটারিচালিত ট্রানজিস্টরই ছিল পুরো গ্রামের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র জানালা।
বাংলার অসংখ্য গ্রামে তখন বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। টেলিভিশন ছিল বিরল, সংবাদপত্র পৌঁছাত এক-দুই দিন পর। তখন খবর, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি পরামর্শ, স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, নাটক, শিশুতোষ অনুষ্ঠান সবকিছুর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল রেডিও।
কৃষকরা মাঠে নামার আগে শুনতেন কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। নদীপাড়ের জেলেরা আবহাওয়ার খবর শুনে নৌকা ছাড়তেন। শিক্ষার্থীরা শুনতেন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। গৃহিণীদের বিকেল কাটত ‘অনুরোধের আসর‘ কিংবা নাটকের অপেক্ষায়। আর রাতের সংবাদ যেন ছিল প্রতিটি পরিবারের অলিখিত নিয়ম।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রেডিও
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে রেডিওর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সাহস, প্রেরণা এবং আশার প্রতীক।
দেশাত্মবোধক গান, যুদ্ধের সংবাদ, স্বাধীনতার বার্তা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে প্রচারিত অনুষ্ঠান লাখো মানুষের মনে জাগিয়ে তুলেছিল বিজয়ের প্রত্যয়। যুদ্ধের সেই দিনগুলোয় রেডিও ছিল কেবল সংবাদমাধ্যম নয়; এটি ছিল স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর।
খেলার উত্তেজনায় থমকে যেত গ্রাম
বিশ্বকাপ ক্রিকেট, এশিয়া কাপ কিংবা ফুটবল বিশ্বকাপ—টেলিভিশন ছিল না অধিকাংশ বাড়িতে। তাই একটি ট্রানজিস্টরকে ঘিরেই জমে উঠত গ্রামের সবচেয়ে বড় আসর। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে ‘চার‘, ‘ছয়‘ কিংবা ‘গোল‘ শব্দ শুনেই উল্লাসে ফেটে পড়ত মানুষ। মাঠে খেলা না দেখেও কেবল কণ্ঠের বর্ণনায় খেলার প্রতিটি মুহূর্ত যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত।
হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্মের স্মৃতি
কিন্তু সময় বদলে গেছে। এখন স্মার্টফোনের পর্দায় এক স্পর্শেই পাওয়া যায় খবর, গান, সিনেমা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সরাসরি সম্প্রচার। ফলে ট্রানজিস্টরের পরিচিত ডায়াল ঘোরানোর শব্দ এখন আর খুব একটা শোনা যায় না।
উলিপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘রেডিও সম্পর্কে জানি, কিন্তু নিয়মিত কখনো শুনিনি। আমাদের সবকিছু এখন মোবাইলেই পাওয়া যায়। তাই রেডিওর সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের আবেগ তৈরি হয়নি।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বাবা-দাদাদের কাছে রেডিওর গল্প শুনেছি। তারা বলতেন, খেলার ধারাভাষ্য শুনতে পুরো গ্রাম একসঙ্গে বসত। এখন সেই দৃশ্য শুধু গল্পেই আছে।’
তবু রেডিও এখনো ফুরিয়ে যায়নি
কুড়িগ্রামের কমিউনিটি রেডিও চিলমারীর স্টেশন ম্যানেজার বশির আহমেদ বলেন, ‘ট্রানজিস্টরের ব্যবহার কমেছে, কিন্তু রেডিওর প্রয়োজন শেষ হয়নি। দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট না থাকলেও রেডিও চালু থাকে। মানুষের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দিতে এটি এখনো সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি। পাশাপাশি অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছেও রেডিওকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
গণমাধ্যম গবেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগেও রেডিওর গুরুত্ব অটুট। দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং কম খরচে জনসচেতনতা তৈরিতে রেডিওর বিকল্প এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
ইতিহাসের শব্দ কখনো মুছে যায় না
প্রযুক্তি বদলায়, মানুষের অভ্যাস বদলায়, যোগাযোগের মাধ্যমও পাল্টে যায়। কিন্তু কিছু শব্দ সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে। হয়তো আর কোনো দিন গ্রামের প্রতিটি উঠানে ট্রানজিস্টরকে ঘিরে মানুষের ভিড় হবে না। সন্ধ্যার খবর শুনতে সবাই একসঙ্গে বসার সেই সামাজিক বন্ধনও আর ফিরবে না। তবু কোনো এক নির্জন বিকেলে, ধুলোমাখা একটি পুরোনো ট্রানজিস্টরের সুইচ ঘোরালে যদি আবার ভেসে আসে ‘বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা...’, তবে মুহূর্তেই ফিরে আসবে একটি হারিয়ে যাওয়া সময়।
কারণ, রেডিও কেবল একটি যন্ত্র ছিল না। এটি ছিল একটি প্রজন্মের স্মৃতি, একটি গ্রামের সামাজিক বন্ধনের প্রতীক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কণ্ঠস্বর এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অমূল্য উত্তরাধিকার।