দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সিংড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মূল ভবনটি চার বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। কাগজে-কলমে ভবনটি পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। ফলে ইউনিয়ন পরিষদের দুটি কক্ষে গাদাগাদি করে চলছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে যেমন নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, তেমনি ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।
১৯৭৭-৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সিংড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি সিংড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ের এই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির গুরুত্ব অনেক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ভবন না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরুতেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন ও কোয়ার্টার ব্যবহারের অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার বিষয়ে তৎকালীন উপপরিচালকের উদ্যোগে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তবে ওই কমিটির লিখিত প্রতিবেদন কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পরিত্যক্ত ঘোষণার কোনো লিখিত চিঠি এখনো পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক এই জটিলতার মধ্যেই ঝুলে আছে ভবনটি পুনর্নির্মাণের প্রক্রিয়া।
মূল ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ার পর সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেনের সহযোগিতায় প্রথমে একটি ভাড়া করা বাড়িতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম চালানো হয়। পরে সেটিও সরিয়ে নেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের দুটি কক্ষে। কিন্তু সীমিত পরিসরের এই ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিকল্প হতে পারছে না। এতে রোগী ব্যবস্থাপনা, ওষুধ সংরক্ষণ, চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
কয়েকদিন আগে স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন মরিচা গ্রামের মোকসেদ আলী। তিনি বলেন, এসে মূল ভবনটি বন্ধ দেখতে পেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, ইউনিয়ন পরিষদের দুটি কক্ষে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম চলছে। তাঁর মতো অনেক রোগীই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানেন না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারী, শিশু ও বয়স্কদের দূরের হাসপাতালে যেতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ততদিন পর্যন্ত অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য এবং সমাজকল্যাণ ও নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিত্যক্ত ভবনে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। জনগণের কথা বিবেচনা করে ইউনিয়ন পরিষদের দুটি কক্ষ স্বাস্থ্যসেবা চালানোর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে, সেটিও প্রশ্ন। তিনি আশা করেন, কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যাটির সমাধানে উদ্যোগ নেবে।
উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা মোছা. হাসনে আরা বানু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ভবন না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের দুটি কক্ষে অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। সেখানে স্টোররুমের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীদেরও একই কক্ষে বসে কাজ করতে হয়। ফলে রোগীদের ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সীমিত জায়গার কারণে নিয়মিত মাসিক ক্যাম্প পরিচালনা, রোগীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাসিক সভা আয়োজনেও নানা সমস্যা হচ্ছে। অল্প জায়গায় স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহমদ ঈসা বলেন, কেন্দ্রটি পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশন প্ল্যানে পুনর্নির্মাণের জন্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মৌখিকভাবে জানতে পেরেছেন। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো নির্মাণকাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
চার বছর ধরে নিজস্ব ভবন ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা চালানোর এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রশ্ন পরিকল্পনা যদি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কবে নাগাদ সিংড়া ইউনিয়নের মানুষ একটি নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ফিরে পাবেন?