লালমনিরহাটের পাটগ্রামে এক গৃহবধূর বিয়ের রেজিস্ট্রিতে নির্ধারিত ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর কেটে ৩ লাখ টাকা করার অভিযোগে কাজির দুই সহযোগীকে আটক করে স্থানীয় গ্রামবাসী। পরে আপসনামায় (মুচলেকা) স্বাক্ষরের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বুধবার (৭ অক্টোবর) দিনগত রাতে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকায় তাদেরকে আটক করে রাখে গ্রামবাসী।
আটককৃতরা হলেন- পাটগ্রাম উপজেলা বুড়িমারী আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ ও পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর সহযোগী জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আতাউর রহমানের ছোট ভাই আজাদ এবং অপরজন একই এলাকার মামুন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের দালালপাড়া গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে অহেদ আলী দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গত ২০২৫ সালে ১০ জানুয়ারি পাটগ্রাম মির্জারকোট এলাকার রিকশাচালক আশাদুল ইসলামের মেয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে রেজিস্ট্রিসহ একটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের স্বাক্ষরিত চুক্তিনামাও তৈরি করে নেন গ্রামবাসী।
বিয়ের পরে প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হলে তা গর্ভপাত করান অহেদ আলী। দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হলে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দেন আরফিনা আক্তার মিম। এরই মাঝে নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করে দেনমোহর ১৭ লাখ টাকা থেকে কেটে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করেন। দেনমোরের টাকা আদালতে জমা দিয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে তালাক দেন অহেদ আলী। সেই তালাকের নোটিশ হাতে পেয়ে হতবাক হয়ে যায় অসহায় পরিবারটি।
শেষে গ্রামবাসীর মাধ্যমে বিয়ের নকল উঠানোর আবেদন করলে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর দুই সহযোগী আজাদ ও মামুন বুধবার নকল নিয়ে মেয়ের বাড়িতে পৌঁছলে গ্রামবাসী তাদের আটকে দেন। এ সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদে দেনমোহর জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেন তারা। পরে আপোষ মীমাংসার মুছলেকায় তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
মুছলেকা মূলে বৃহস্পতিবার পাটগ্রাম পৌর বিএনপির সভাপতি মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল ও পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানার নেতৃত্বে আপোষ বৈঠকে বসলে সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকারোক্তি দেন নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর প্রতিনিধি তার ভগ্নিপতি। কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে বৈঠক মানেনি গ্রামবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি।
প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামবাসী তাদের আটক করলেও পরে আপোষ মীমাংসার স্বার্থে মুক্ত করা হয়। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা লিখা হলেও পরবর্তীতে নিকাহ রেজিস্ট্রারের নির্দেশে নকলে দেনমোহর ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা লিখা হয়েছে বলেও জনতার সামনে স্বীকার করেছেন আটক ব্যক্তিরা। থানায় এবিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।
বিয়ের ভলিয়ম বইয়ের লেখক কাজীর সহযোগী হাফিজুল ইসলাম বলেন, কাজী ইউনুস আলীর ভলিয়ম বইয়ের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রির কাজ আমি করে থাকি। ১৭ লাখ টাকার দেনমোহরের বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজটিও আমি করেছি। মূল ভলিয়মে দেনমোহর অঙ্কে এবং কথা লিখেছিলাম ১৭ লাখ টাকা। এ বিয়ে নিবন্ধন বাবদ কাজী ইউনুস আলী ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। দেনমোহর কমালে সেটা ইউনুস কাজী বলতে পারবেন।
অভিযুক্ত পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী ইউনুস আলীর সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বৈঠকে উপস্থিত পাটগ্রাম পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল বলেন, জনতার কাছে আটকরা জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে অভিযুক্ত কাজী ইউনুস আলী আত্মগোপনে থাকায় সমাধান করা সম্ভব হয়নি। ইতিপূর্বেও দেনমোহর জালিয়াতিসহ নানান নারী কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পাটগ্রাম থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়দের মোবাইলে দেনমোহরনা জালিয়াতি ও আটকদের বিষয়টি জেনেছি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।