কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার সন্দেহভাজন মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট নোটিশ জারি করেছে ইন্টারপোল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইন্টারপোল এই নোটিশ জারি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মামলাটি (তনু হত্যা মামলা) বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমকে মামলাটির তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের প্রয়োজনে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করার আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে এই দুই আসামি।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পলাতকদের আন্তর্জাতিকভাবে শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয় করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের জন্য রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানায় পিবিআই। এরপর ইন্টারপোলের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরো (এনসিবি) এই রেড অ্যালার্ট নোটিশ জারির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে। মামলা সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথিপত্র যাচাই শেষে ইন্টারপোল মঙ্গলবার দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করেছে।
রেড নোটিশ জারির পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, এখন ইন্টারপোলের সদস্য দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযুক্তদের শনাক্ত ও অবস্থান নির্ণয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতা দিতে পারবে। কোনো দেশে তাদের অবস্থান শনাক্ত হলে সে দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় পরের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সন্দেহভাজনরা কে কোথায়
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেনাসদস্য জাহিদুজ্জামান জাহিদ, শাহীন আলম দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। পুলিশ তাদের সর্বশেষ অবস্থান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পেয়েছিল। এরপর থেকে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জাহিদ ও শাহীন পালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর ফেরেননি সোহাগী জাহান তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তার লাশ পাওয়া যায়। পরদিন তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
শুরুতে মামলাটির তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তভার যায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। এর কয়েক দিন পর মামলা যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)।
তদন্তের শুরুতেই ময়নাতদন্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। প্রথম ময়নাতদন্তে তনুর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। পরে আদালতের নির্দেশে মরদেহ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করা হয়। এর মধ্যে তনুর পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
২০১৭ সালে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে তিনজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে। এ তথ্য মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ওই ডিএনএ কার, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
একই বছর অক্টোবর মাসে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। তদন্তকারীরা বিভিন্ন ব্যক্তির তথ্য যাচাই করে ডিএনএসহ অন্যান্য আলামত নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘ তদন্তের পরও মামলায় কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
প্রায় সাড়ে চার বছর সিআইডির তদন্ত চলার পর ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর মামলাটি পুলিশের তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআইও দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চালায়। এর মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তাও পরিবর্তন হয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পিবিআই পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর নতুন করে পুরোনো আলামত, ডিএনএ প্রোফাইল ও সন্দেহভাজনদের বিষয়ে কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালে আদালতের নির্দেশে সন্দেহভাজন কয়েকজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।