দূরপাল্লার যাত্রায় যাত্রীদের আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্লিপার বাস। শুয়ে বা আধশোয়া অবস্থায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক যাত্রীর কাছেই এসব বাস আকর্ষণীয়। বিশেষ করে রাতের যাত্রায় স্লিপার বাসকে অনেকে সাধারণ বাসের তুলনায় আরামদায়ক বিকল্প হিসেবে দেখছেন। তবে সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে শুধু যাত্রীসুবিধা থাকলেই কোনো যানবাহন অনুমোদন পাওয়ার যোগ্য হয় না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে কারিগরি নিরাপত্তা, যানবাহনের কাঠামো, নিবন্ধন, ফিটনেস এবং সড়ক পরিবহন আইনের নানা শর্ত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই হাইওয়েতে স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি চেয়ে করা রিট খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছেন, মহাসড়কে কেবল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ (BRTA) অনুমোদিত বাসই চলাচল করতে পারবে। একই সঙ্গে কারিগরি শর্ত লঙ্ঘন করে যানবাহন পরিচালনার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধানও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান থাকতে পারে।
স্লিপার বাস নিয়ে কেন এত আলোচনা?
সাধারণ বাসের আসনের পরিবর্তে স্লিপার বাসে যাত্রীদের শোয়ার বা অধিক স্বাচ্ছন্দ্যে বসার ব্যবস্থা থাকে। দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় এটি যাত্রীদের শারীরিক ক্লান্তি কমাতে পারে। কিন্তু একটি বাসের অভ্যন্তরীণ নকশা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার ওজনের ভারসাম্য, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, আসনবিন্যাস, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং চালনার বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন আসতে পারে।
এ কারণেই কোনো বাসকে শুধু ব্যবসায়িক বা যাত্রী চাহিদার ভিত্তিতে সড়কে নামিয়ে দেওয়া যায় না। যানবাহনের কাঠামো ও নকশা নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
আরামের সঙ্গে নিরাপত্তার সমন্বয় জরুরি
দূরপাল্লার বাসযাত্রায় যাত্রীদের অন্যতম প্রত্যাশা হলো নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ। স্লিপার বাস সেই আরামের একটি নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। কিন্তু আরামের জন্য যদি নিরাপত্তার কোনো শর্ত উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেই সুবিধাই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
একটি দুর্ঘটনার সময় সাধারণ বাসের তুলনায় ভিন্ন ধরনের আসন বা বেড বিন্যাসে যাত্রীদের নিরাপদে বের হয়ে আসার সুযোগ কতটা রয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একইভাবে অগ্নিকাণ্ড, সংঘর্ষ কিংবা বাস উল্টে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে জরুরি বহির্গমন পথ কতটা কার্যকর, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, নতুন ধরনের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে সেটিকে যথাযথ কারিগরি মানদণ্ডের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তি ও যাত্রীসেবার পরিবর্তন স্বাভাবিক; কিন্তু নিরাপত্তার মানদণ্ডের সঙ্গে আপস করা যায় না।
বিআরটিএ অনুমোদনের গুরুত্ব
বাংলাদেশে সড়কে কোনো যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে বিআরটিএর অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি বাস দেখতে আধুনিক কিংবা যাত্রীবান্ধব হলেই সেটি মহাসড়কে চলাচলের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না।
যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং নির্ধারিত কারিগরি শর্ত পূরণসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকতে হয়। ফলে স্লিপার বাসের ক্ষেত্রেও একই নীতিই প্রযোজ্য। আদালতের সাম্প্রতিক অবস্থান মূলত এই মৌলিক বিষয়টিকেই সামনে এনেছে—মহাসড়কে চলাচলের অনুমতি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনকে আইন ও কারিগরি বিধিমালা মেনে চলতে হবে।
পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্য বার্তা
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। যাত্রীদের চাহিদা বাড়ছে বলে দ্রুত নতুন ধরনের বাস চালু করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু অনুমোদন ছাড়া কিংবা অনুমোদিত নকশা ও কারিগরি বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে কোনো যানবাহন পরিচালনা করা হলে সেটি শুধু প্রশাসনিক সমস্যাই নয়, জননিরাপত্তারও কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে একটি বাসের মূল কাঠামো পরিবর্তন, আসনসংখ্যা ও বিন্যাসে পরিবর্তন, শোয়ার ব্যবস্থা সংযোজন কিংবা অন্য কোনো বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে
সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু বাস মালিক, চালক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নয়; যাত্রীদেরও সচেতন ভূমিকা রয়েছে। যাত্রার আগে বাসটি বৈধভাবে চলাচল করছে কি না, ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার।
অনেক সময় কম ভাড়া, বিলাসবহুল সুবিধা কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর আকর্ষণে যাত্রীরা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করেন। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নতুন পরিবহনব্যবস্থার পথ বন্ধ নয়
হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে শুধু স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল তাৎপর্য হয়তো আড়াল হয়ে যাবে। বরং এটি গণপরিবহনে নতুন প্রযুক্তি ও সেবার ক্ষেত্রে নিয়ম, অনুমোদন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
স্লিপার বাস যদি নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পায় এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিবহনব্যবস্থা আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বিকাশ হতে হবে আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই।
বাংলাদেশের মহাসড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত করেন। তাদের জন্য আরাম যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা। আধুনিক বাস, উন্নত সেবা কিংবা শুয়ে ভ্রমণের সুবিধা যাত্রীবান্ধব পরিবহনের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধা কোনোভাবেই নিরাপত্তা ও আইনগত অনুমোদনের বিকল্প নয়।
হাইওয়েতে কোন বাস চলবে, কী ধরনের কারিগরি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে এবং কোন শর্তে একটি যানবাহনকে অনুমোদন দেওয়া হবে এসব বিষয়ে কঠোরতা শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে। তাই স্লিপার বাস নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ‘চলবে কি চলবে না’ নয়; বরং ‘কীভাবে নিরাপদ, বৈধ ও অনুমোদিতভাবে চলবে’ এই প্রশ্নটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।