সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার কারণে কেউ ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার থেকে সাধারণ দায়মুক্তি পান না। তবে সংসদ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে সংবিধান, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি এবং দেওয়ানি কার্যবিধিতে কিছু বিশেষ সুরক্ষার বিধান রয়েছে। এসব বিধানে কোথায় স্পিকারের অনুমতি প্রয়োজন এবং কোথায় শুধু তাঁকে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে, তা আলাদাভাবে নির্ধারিত।
সংসদের বাইরে কোনো ফৌজদারি মামলায় একজন এমপিকে গ্রেপ্তারের জন্য সাধারণভাবে স্পিকারের আগাম অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তবে কোনো সদস্য ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার বা আটক হলে, কিংবা আদালতের আদেশে কারাদণ্ড হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষকে কারণ উল্লেখ করে অবিলম্বে স্পিকারকে জানাতে হয়।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭২ বিধিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য ফৌজদারি অভিযোগে বা ফৌজদারি অপরাধে গ্রেপ্তার হলে, আদালত কারাদণ্ড দিলে অথবা নির্বাহী আদেশে আটক হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত ফরমে গ্রেপ্তার, আটক বা কারাদণ্ডের কারণ উল্লেখ করে বিষয়টি স্পিকারকে জানাতে হবে।
অর্থাৎ, সংসদের বাইরে ফৌজদারি মামলায় কোনো এমপিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আগে স্পিকারের অনুমতি নেওয়ার বিধান নেই; বরং গ্রেপ্তার বা আটকের পর স্পিকারকে অবহিত করার বিধান রয়েছে।
তবে সংসদের সীমানার ভেতরে কাউকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে নিয়মটি ভিন্ন। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৪ বিধিতে বলা হয়েছে, স্পিকারের অনুমতি ছাড়া সংসদ ভবন বা এর নির্ধারিত সীমানার মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। এ বিধানে শুধু সংসদ সদস্য নয়, যেকোনো ব্যক্তির গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে স্পিকারের অনুমতির কথা বলা হয়েছে।
ফলে ১৭২ ও ১৭৪ বিধির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো—সংসদের বাইরে ফৌজদারি মামলায় এমপিকে গ্রেপ্তারের পর স্পিকারকে অবহিত করতে হয়, আর সংসদের সীমানার ভেতরে কাউকে গ্রেপ্তারের আগে স্পিকারের অনুমতি নিতে হয়।
এদিকে দেওয়ানি মামলায় সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক সুরক্ষা রয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৫এ ধারায় সংসদের অধিবেশন চলাকালে এবং অধিবেশন বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকের আগে ও পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো সংসদ সদস্যকে দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার বা কারাগারে আটক করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে এই সুরক্ষা দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ১৩৫এ ধারার ওই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয়।
সংসদ সদস্যদের বিশেষাধিকারের বিষয়টি সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদেও উল্লেখ রয়েছে। সংসদে বক্তব্য দেওয়া, ভোট দেওয়া এবং সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে এ বিশেষাধিকার প্রযোজ্য। সংসদে দেওয়া বক্তব্য বা ভোটের কারণে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে কার্যক্রম নেওয়া যাবে না—সংবিধানে এমন সুরক্ষা রয়েছে। তবে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার থেকে সংসদ সদস্যদের সর্বাত্মক দায়মুক্তি দেওয়া হয়নি।
কোনো এমপি গ্রেপ্তার হলে তাঁর ক্ষেত্রেও সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে থাকা গ্রেপ্তার ও আটক-সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের কারণ জানানো এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার মতো সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।
সুতরাং, আইনগত কাঠামো অনুযায়ী সংসদের বাইরে ফৌজদারি মামলায় কোনো এমপিকে গ্রেপ্তারের জন্য সাধারণভাবে স্পিকারের আগাম অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে গ্রেপ্তার, আটক বা কারাদণ্ডের বিষয়টি কারণসহ স্পিকারকে অবহিত করতে হয়। অন্যদিকে, সংসদের সীমানার মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে হলে আগে স্পিকারের অনুমতি নিতে হয়। আর দেওয়ানি মামলায় সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বিশেষ গ্রেপ্তার ও আটক-সুরক্ষা রয়েছে।