কাগজবিহীন বিচারিক কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় আরও একটি ই-পারিবারিক আদালত চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এটি হবে দেশের প্রথম ই-পারিবারিক আপিল আদালত। এর মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীরা ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে মামলা দায়ের, শুনানিতে অংশগ্রহণ, সাক্ষ্য প্রদান ও জিজ্ঞাসাবাদে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো- কাগুজে নথিপত্রের ব্যবহার কমানো, আদালত ও আইনজীবীর চেম্বারে বিচারপ্রার্থীদের সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনা এবং মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমেই মামলার তথ্য ও বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে পারিবারিক বিচারিক সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করে তোলা।
সরকার গত বছরের শেষের দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একটি করে মোট দুটি ই-পারিবারিক আদালত চালু করে। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই এখন ঢাকায় আরও একটি ই-পারিবারিক আদালত এবং দেশের প্রথম ই-পারিবারিক আপিল আদালত চালুর প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, ঢাকার ই-পারিবারিক আদালত ৫-এ এখন পর্যন্ত মোট ১৬৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গত বছর দায়ের করা দুটি মামলাও। এসব মামলার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৬টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
ডিজিটাল এই পদ্ধতির ফলে বিচারপ্রার্থীরা গতানুগতিক ব্যবস্থার মতো ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা না করে সামান্য ফি প্রদান করেই তাৎক্ষণিকভাবে আদালতের আদেশের সার্টিফাইড কপি (সত্যায়িত অনুলিপি) পেয়ে যাচ্ছেন। প্রদত্ত ফি সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে এবং ডিজিটাল সার্টিফাইড কপিতে থাকা কিউআর কোডের মাধ্যমে সহজেই এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য চারজন বিচারকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। ই-পারিবারিক আদালতের কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে ঢাকা ও চট্টগ্রামের এক হাজারেরও বেশি আইনজীবীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘মামলা দায়ের করা থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত সমস্ত কার্যক্রম ‘ই-পারিবারিক আদালত’ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন হয়। ফলে, বিচারপ্রার্থীদের এখন আর প্রতিকার পাওয়ার জন্য বারবার আদালতে ছুটতে হবে না বা আইনজীবীদের কাছে বারবার যেতে হবে না। তাদের কেবল ই-পারিবারিক আদালত ব্যবস্থায় নিবন্ধন করতে হবে, সুরক্ষিত পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে লগইন করতে হবে এবং অনলাইনে মামলা দায়ের করতে হবে।’
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিচারপ্রার্থীরা সিস্টেমে লগইন করার পর নিজেদের ড্যাশবোর্ডে মামলার সব প্রাসঙ্গিক তথ্য দেখতে পারবেন। এরপর তাদের আর আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ারও প্রয়োজন হবে না। কেননা মুঠোফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমেই বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া যাবে।
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে এ ব্যবস্থা কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিচারকদের হাতে লিখে নথিপত্র তৈরি বা কাগজের নথিপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজন না থাকায় এটি মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনবে। তিনি আরো বলেন, সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ হয় এবং অনলাইন রেজিস্টারে সংরক্ষিত থাকে। এ ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য আমরা চারজন বিচারককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ই-পারিবারিক আদালত পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের এক হাজারের বেশি আইনজীবীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এই সেবা আরো ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, যেসব বিচারপ্রার্থীর স্মার্টফোন নেই কিংবা যারা পড়তে ও লিখতে পারেন না, তারা সরকারি আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড) সেবার মাধ্যমে আইনজীবীদের সহায়তা নিতে পারবেন। আইনজীবীরা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তাদের দিকনির্দেশনা দেবেন।
বিচারপ্রার্থী, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের বিষয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বিচারপ্রার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাদের গোপনীয়তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। এছাড়া এ বিষয়ে আদালতগুলোকে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রথমবারের মতো ইন্টার্ন নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছে মন্ত্রণালয়।