আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে ‘অনৈতিক সম্পর্কে’ জড়ানোর চরম মূল্য চোকাতে হলো পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম সাকলায়েন শিথিলকে। দীর্ঘ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।
এক সময়ের দাপুটে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তার পতনকাহিনি আধুনিক অপরাধ ও বিনোদন জগতের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন, যা রূপ নিয়েছে এক চরম ট্র্যাজেডিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই গুরুদণ্ড দেওয়ার কথা জানানো হয়, যা দেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২১ সালের জুন মাসে। ঢাকার বোট ক্লাবে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে সাড়া ফেলেছিলেন নায়িকা পরীমনি। সেই হাই-প্রোফাইল মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা তথা ডিবি। আর সেই তদন্তের তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে সামনে আসেন ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন এডিসি গোলাম সাকলায়েন। মামলার তদন্ত করতে গিয়েই মূলত পরীমনির সংস্পর্শে আসেন তিনি। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের সীমানা পেরিয়ে সাকলায়েন নিজেই জড়িয়ে পড়েন এক নিষিদ্ধ প্রণয় উপাখ্যানে, যা পরবর্তীতে তার সাজানো ক্যারিয়ারকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দেয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ও মামলার বাদীর এই গোপন রসায়ন প্রথম প্রকাশ্যে আসে ওই বছরেরই ৪ আগস্ট, যখন পরীমনির বনানীর বাসায় আকস্মিক অভিযান চালায় র্যাব। সেদিন পরীমনি ও তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপুকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আটক করা হয়। একই রাতে চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও তার ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকেও আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করা হয়।
এই অভিযানের রেশ ধরেই সংবাদমাধ্যমে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, র্যাবের অভিযানের ঠিক তিন দিন আগে, ১ আগস্ট সকালে পরীমনি নিজের বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে গোলাম সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে যান। সেখানে তিনি প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় কাটান এবং গভীর রাতে ভিন্ন পোশাকে বেরিয়ে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাদের এই অন্তরঙ্গ যাতায়াতের দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে বদলি করা হয়। তবে বিষয়টি সেখানেই থিতিয়ে যায়নি। একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি নিজে বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক, তার এমন আচরণকে ‘গুরুতর অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করে পুলিশ প্রশাসন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, সাকলায়েন তার স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সরকারি বাসভবনে পরীমনির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং এমনকি নিজেদের জন্মদিন উদযাপনের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন। এই ধরণের অপেশাদার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ এবং খবর প্রচারের ফলে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে মন্তব্য করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী বিধিমালার আওতায় একটি আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে তিন মাস পর তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং সে বছরেরই আগস্ট মাসে তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ শতভাগ প্রমাণিত হয়। সর্বশেষ তিনি ঝিনাইদহের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ বছরের নাটকীয়তা ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলো। এর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটল একসময়ের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারধারী এক পুলিশ অফিসারের, যিনি পেশার চেয়ে পরীর প্রেমকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।