সাভারে উদ্ধার ও পরে নিষ্ক্রিয় করা ‘কেটলি বোমা’য় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক আরডিএক্স ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার পর সংগ্রহ করা আলামত রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
গত ১২ আগস্ট দুপুরে সাভারের সাধাপুর এলাকায় একটি মসজিদের খোলা মাঠে কালো স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেশার কুকার পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিস্পোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করে। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকেও বিকট শব্দ শোনা যায় এবং আকাশে সাদা ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে থাকা ডিএমপির বোম ডিস্পোজাল ইউনিটের এক বোমা বিশেষজ্ঞ জানান, বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বের হওয়া সাদা ধোঁয়ার সঙ্গে বিস্ফোরকের গন্ধ পাওয়া যায়। এ কারণে তাঁদের ধারণা, এতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। বিস্ফোরকের উপস্থিতির কারণেই ধোঁয়ার সঙ্গে তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান তিনি।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করে তাঁদের ধারণা, বোমাটিতে উচ্চ ক্ষমতার বিস্ফোরক আরডিএক্স অথবা টিএটিপি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে অতীতে কোনো বোমায় এ ধরনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়নি। এমনকি এ ধরনের বিস্ফোরক আগে কখনো উদ্ধারও হয়নি।
আরডিএক্স সম্পর্কে জানতে চাইলে সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা জানান, আরডিএক্স হলো ১.৩.৫ ট্রাইনাইট্রোপারহাইড্রো নামে একটি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক যৌগ। আইইডি (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) ডেটোনেট করার ক্ষেত্রে আরডিএক্সের উপস্থিতি থাকলে তা অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণের সময় বাতাসে এর তাপমাত্রা প্রায় ৩৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩৬০০ কেলভিন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন তীব্র তাপে কাঠ, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন শক্ত উপাদান মুহূর্তেই পুড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে লোহা, স্টিল ও টিনের মতো ধাতুও গলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আরডিএক্স ব্যবহার করা বোমার ঘটনা রয়েছে। এ ধরনের বোমা বিস্ফোরিত হলে একটি বহুতল ভবনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কেবল কাঠামোতে পরিণত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, সাভারে নিষ্ক্রিয় করা কেটলি বোমাটিতে আরডিএক্সের পাশাপাশি টিএটিপি (ট্রাইএসিটোন ট্রাইপারক্সাইড) ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাছে রাসায়নিক পরীক্ষা করার জন্য আলামত পাঠানো হয়েছে।
বোমাটিতে ঠিক কী ধরনের বিস্ফোরক এবং কী মাত্রায় তা ব্যবহার করা হয়েছিল, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আরডিএক্স কী?
আরডিএক্স একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উচ্চ-বিস্ফোরক (High Explosive) পদার্থ। এর প্রচলিত ইংরেজি নাম Research Department Explosive এবং রাসায়নিক নাম Cyclotrimethylenetrinitramine। সামরিক ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত কাজে উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক হিসেবে এর ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।
সাধারণ দাহ্য পদার্থের মতো আরডিএক্স ধীরে ধীরে জ্বলে না। উচ্চ-বিস্ফোরকের বৈশিষ্ট্য হলো, বিস্ফোরণের সময় অত্যন্ত দ্রুত শক্তি ও গ্যাস উৎপন্ন করে এবং শক্তিশালী বিস্ফোরণ তরঙ্গ সৃষ্টি করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আশপাশে তীব্র চাপ ও তাপের প্রভাব তৈরি হতে পারে।
কেন এত শক্তিশালী?
আরডিএক্সের ভয়ংকর দিক হলো এর দ্রুত শক্তি মুক্ত করার ক্ষমতা। বিস্ফোরণের সময় অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল শক্তি নির্গত হওয়ার ফলে প্রচণ্ড চাপ, তাপ ও বিস্ফোরণ তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে।
এর প্রভাবের মাত্রা অবশ্য সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। ব্যবহৃত পরিমাণ, বিস্ফোরণের ধরন, আশপাশের পরিবেশ এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে। তাই আরডিএক্সের বিস্ফোরণ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বা ধ্বংসক্ষমতা উল্লেখ করে সব পরিস্থিতির ফলাফল নির্ধারণ করা ঠিক নয়।
তবে এটুকু স্পষ্ট যে, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক হিসেবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
কোথায় ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে?
আরডিএক্সের ব্যবহার মূলত সামরিক ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন দেশের সামরিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবস্থায় এর ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।
তবে একই কারণে বিভিন্ন সময় অবৈধ বিস্ফোরক ব্যবহার ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাতেও আরডিএক্সের নাম সামনে এসেছে। এর উচ্চ বিস্ফোরণক্ষমতার কারণে এটি আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদার্থ।
সাধারণ বিস্ফোরক থেকে পার্থক্য কোথায়?
বিস্ফোরক মানেই সব পদার্থের বৈশিষ্ট্য এক নয়। কিছু বিস্ফোরক তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী এবং নির্দিষ্ট বৈধ শিল্প বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে আরডিএক্সের মতো উচ্চ-বিস্ফোরক পদার্থ অত্যন্ত দ্রুত ও তীব্র বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
এই দ্রুত শক্তি মুক্তির কারণেই উচ্চ-বিস্ফোরকের প্রভাব সাধারণ দাহ্য পদার্থের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে। সে কারণে এ ধরনের পদার্থের ব্যবহার, সংরক্ষণ ও পরিবহন কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকে।