সামাজিক লজ্জা, মানসম্মান হারানোর ভয় এবং অপরাধী চক্রের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা সর্বস্ব হারিয়েও পুলিশের দ্বারে যাচ্ছেন না।
ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সাধারণ বন্ধুত্বের বার্তা। সেখান থেকেই আলাপ। তারপর চাতুর্যের সাথে তৈরি করা নিখুঁত এক প্রেমের সম্পর্ক। ভালোবাসার টানে একান্তে দেখা করতেই রূপ নেয় চরম দুঃস্বপ্ন। একটি ঘরে আটকে রেখে চলে মারধর। বিবস্ত্র করে গোপনে ধারণ করা হয় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও। মুহূর্তে নেমে আসে জিম্মিদশা এবং দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
এমনই এক অদৃশ্য ফাঁদে সর্বস্ব হারাচ্ছেন খুলনার বিত্তশালীরা। কিন্তু কেউ মুখ খুলছেন না। পুলিশের দ্বারেও যাচ্ছেন না। আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো। শহরটিজুড়ে এখন এমনই ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ভালোবাসার ছদ্মবেশী এক নতুন আতঙ্ক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনায় অন্তত ১৫ থেকে ২০টি অপরাধী চক্র বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে। সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করে মূলত উঠতি বয়সী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইনজীবী ও ব্যাংকারদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেট। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বা মেসেঞ্জারে যোগাযোগের পর নির্জন কোনো ফ্ল্যাট বা আবাসিক হোটেলে ডেকে এনে জিম্মি করা হয় শিকারকে। এরপর আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্প বা ব্যাংকের চেকে সই নেওয়া হয় এবং আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ।
সম্প্রতি নগরীর সোনাডাঙ্গা, বটিয়াঘাটা ও ফুলতলায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বেশ কয়েকটি চক্রের নারী সদস্যসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে। সোনাডাঙ্গার একটি ফ্ল্যাট থেকে সাত নারী সদস্যকে গ্রেপ্তারসহ উদ্ধার করা হয় স্বাক্ষর করা ব্ল্যাংক চেক ও স্ট্যাম্প। তবে পুলিশি জালে কিছু সদস্য ধরা পড়লেও মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, প্রতারণার শিকার হওয়ার পর পুলিশের কাছে গেলে উল্টো হয়রানি ও বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া এই অপরাধী চক্রগুলোর পেছনে কতিপয় ভুয়া সাংবাদিক, নামধারী নেতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া থাকায় সাধারণ মানুষ আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
খুলনা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সুশাসনের অভাবের কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা যদি সাহস করে মামলা না করেন, তবে এই চক্রগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান জানান, অসচেতনতা ও অনৈতিক প্রলোভনে পা দেওয়ার কারণেই মানুষ এ ধরনের বিপদে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছি। ভুক্তভোগীরা গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ দিলে পুলিশ দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’