সিসিটিভিতে ধরা পড়লো ‘পিচ্চি রাজা’র পালানোর দৃশ্য

প্রিজন ভ্যান থেকে কথিত ‘পিচ্চি রাজা’ ওরফে রাজা পালানোর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। রাজধানীর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে প্রিজন ভ্যান থেকে তার বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরায়। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, গাজীপুরের বাইমাইল নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার থেকেই তিনি পালিয়েছেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা ৫৮ মিনিটের দিকে তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে যানজটে পড়ে প্রিজন ভ্যানটি। এ সময় ভ্যানটির পেছনের দরজা খুলে তিনজনকে বের হতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা, দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাস এবং আরেক আসামি খাইরুল বাশার।

ফুটেজে দেখা যায়, সাদা পোশাক পরা পিচ্চি রাজা প্রথমে ভ্যান থেকে নেমে সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। এরপর এসআই প্রবীর কুমারও তার পেছনে বেরিয়ে আসেন। খাইরুল বাশার কিছুদূর যাওয়ার পর আবার প্রিজন ভ্যানে ফিরে গিয়ে চালকের পাশের আসনে বসেন। কিন্তু পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর আর ভ্যানে ওঠেননি।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, তাঁতীবাজারে আগে থেকেই একটি ব্যক্তিগত গাড়ি অপেক্ষা করছিল। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর পরে ওই গাড়িতে ওঠেন। যদিও গাড়িতে ওঠার দৃশ্য সিসিটিভিতে ধরা পড়েনি। তদন্তকারীদের ভাষ্য, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। পুলিশের অভিযোগ, পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা ও অন্য সহযোগীরা ওই গাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন। এসআই প্রবীর কুমার তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার পর প্রিজন ভ্যানটি বাকি ২৮ জন আসামিকে নিয়ে কাশিমপুরের দিকে চলে যায়।

এরপর ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছানোর পর এসআই প্রবীর আবার ভ্যানে যোগ দেন। পরে কারাগারে পৌঁছে দাবি করা হয়, পিচ্চি রাজা বাইমাইল বা নাওজোড় এলাকায় প্রস্রাব করার কথা বলে ভ্যান থেকে নেমে সুযোগ বুঝে পালিয়ে যান। তদন্তে ওই বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

ঘটনার পর দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং তিন কনস্টেবল রয়েছেন। পরবর্তী তদন্তে এসআই প্রবীর, চালক কামাল হোসেন ও পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং ঘটনার প্রকৃত তথ্য আড়াল করার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্তভার গাজীপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কাছে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের তথ্যমতে, পিচ্চি রাজা ঢাকার মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে দেশে ফেরার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা এখন পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাকে পালাতে সহায়তাকারী অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে তাঁতীবাজারে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি, গাড়ির চালক এবং পালানোর পরিকল্পনায় আরও কারা যুক্ত ছিলেন, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর ঘটনাটির প্রাথমিক বর্ণনা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা আরও জোরালো হয়েছে। এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন হলো- প্রিজন ভ্যান থেকে একজন আসামিকে কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই বের করে দেওয়া হলো এবং ঘটনার পর প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা কেন করা হয়েছিল।