'লাপাত্তা' বেনজীর, দুদকে হাজিরা অনিশ্চিত!

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২৮ মে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ৬ জুন (বৃহস্পতিবার ) এবং ৯ জুন সাবেক এই আইজিপির স্ত্রী ও সন্তানদের  তলব করে দুদক। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে,দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তলব করে গত সপ্তাহে গুলশানের বাসায় চিঠি দিলেও তা গ্রহণ করেননি বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ফলে আগামীকাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেনজীর আহমেদ দুদকে হাজির হচ্ছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
 
এদিকে ইমিগ্রেশন পুলিশের একাধিক সূত্র জানায় , বেনজীর আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যরা ৪ মে রাতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর সেখান থেকে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। বর্তমানে তিনি সপরিবারে দুবাই অবস্থান করছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে বেনজিরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, স্ত্রী জীশান মির্জার শরীরে অস্ত্রোপচারের জন্য সিঙ্গাপুরে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছেন। ফলে আগামী ৬ জুন দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে আসবেন না সাবেক পুলিশপ্রধান। স্ত্রীর অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়ে দুদকে হাজির হওয়ার জন্য আইনজীবীর মাধ্যমে সময় আবেদন করবেন তিনি।

জানা যায়, যেসকল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত হচ্ছে তার মধ্যে বেনজীরের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ইকো রিসোর্ট। এই রিসোর্টের পাশে আরও ৮০০ বিঘা জমি কিনেছে তাঁর পরিবার। এ ছাড়া পাঁচ তারকা হোটেলের ২ লাখ শেয়ারও রয়েছে তাঁদের। ঢাকার বসুন্ধরায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটও রয়েছে বেনজীরের পরিবারের। এছাড়াও গাজীপুর সদরের ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের নলজানী গ্রামে ১৬০ বিঘা জমির ওপর ভাওয়াল রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এই রিসোর্ট করতে বনের ২০ বিঘা জমি দখল করা হয়েছে। রিসোর্টের ২৫ শতাংশের মালিকানা বেনজীর আহমেদের পরিবারের। এছাড়া দেশের বাইরে দুবাইয়ে শতকোটি টাকার হোটেল ব্যবসা, সিঙ্গাপুরে সোনার ব্যবসা এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় তাঁর পরিবারের জমি রয়েছে বলে একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুদকে বেনজীর আহমেদ উপস্থিত না হলে দুদক কী ধরনের ব্যবস্থা নিবে এমন প্রশ্নে দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক বলেন, দুদক কাউকে নোটিশ করলে তিনি আসতে বাধ্য কিনা না, সেটা আইনে সুস্পষ্ট (বাধ্যবাধকতা) বলা নেই। তবে না আসলে ধরে নিতে হবে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই। এক্ষেত্রে তাঁর সুযোগ আছে সময় চাওয়ার। সময় চাইলে দুদক ১৫ দিন সময় দিতে পারবে। দুদকের এই এখতিয়ার রয়েছে। বেনজীর আহমেদ উপস্থিত না হলে দুদক তিনটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে।

দুদক কমিশনার আরও বলেন, সময় দেওয়ার পরও যদি তিনি দুদকে না আসেন তাহলে ধরে নিতে হবে তার কোনো বক্তব্য নেই। তখন  নথিপত্র দেখে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশে রয়েছেন কিনা জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, দেশে আছে নাকি বিদেশে গেছে এ সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে জানা নেই। অনুসন্ধানের স্বার্থে যা যা করণীয়, দুদকের পক্ষ থেকে সবই করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও বিচার হবে, এতে কোনো বাধা নেই। এটা আদালত বুঝবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম বলেন, অবশ্যই ৬ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এলে এক ধরনের কনসিকোয়েন্স, না এলে আরেক ধরনের কনসিকোয়েন্স। এমনও হতে পারে উনি আইনজীবীর মাধ্যমে সময় চাইতে পারেন। কাজেই ৬ তারিখ পার না হলে কিছুই বলা যাবে না।যদি নির্ধারিত সময়ে না আসেন, তাহলে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে ।

বেনজীরের আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, আমি জানি না উনি কোথায় আছেন। সপ্তাহখানেক আগে উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনার সঙ্গে আমার যেটুকু কথা হয়েছে সেটা হলো, ওনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উঠেছে এবং দুদক সেটার তদন্ত করছে। উনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছে সুতরাং উনি আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।’

এর আগে গত ২৩ এপ্রিল বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী সন্তানদের নামে অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এরপর সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের লেনদেনের হিসাব চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তীতে গত ২৩ মে প্রথম দফায় বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৩৪৫ বিঘা (১১৪ একর) জমি জব্দ (ক্রোক) এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে তাঁদের নামে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব (অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন আদালত। গত রোববার আরও ১১৯ দলিলে কয়েক কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজের আদেশ দেন আদালত