অনলাইন জুয়ায় উৎসাহিত করছেন ঢালিউড তারকারা!

কয়েক বছর যাবৎ দেশে অনলাইন জুয়ার বাজার ব্যাপক জমজমাট হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইনে যেকোনো ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ হলেও জুয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কৌশলে তাদের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি তরুণদের জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট করতে জুয়া প্রতিষ্ঠানগুলো লোভনীয় টাকার অফার দিয়ে ব্যবহার করছে গায়ক, খেলোয়াড় এবং শোবিজ তারকাদের।

২০২২ সালে অনলাইন জুয়ার সাইট বেটউইনারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেটউইনার নিউজের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন সাকিব আল হাসান। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিলেও ঢালিউড তারকারা থেমে নেই। তাদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অনলাইন জুয়া সাইটগুলো ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি অর্থপাচার প্রক্রিয়ার প্রসারে কাজ করছে। 

তথ্য বলছে, গত ১৮ মে অনলাইন জুয়ার সাইটের শুভেচ্ছাদূত হিসাবে নাম এসেছে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও শবনম বুবলীর। ২৫ মে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় মাহিয়া মাহি তাদের শুভেচ্ছাদূত হওয়ার খবর জানান। এর আগে মার্চে জুয়ার আরেকটি প্রতিষ্ঠান শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নাম ঘোষণা করে বর্তমান সময়ে ঢালিউডের আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমণির। পরবর্তীতে ২ জুন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ওই প্রতিষ্ঠানের একটি বিজ্ঞাপন পোস্ট করে তাদের ওয়েবসাইট ভিজিটের আমন্ত্রণ জানান এই নায়িকা। শোবিজ অঙ্গনের তারকাদের উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা অনুসরণ করে। কিন্তু আইনে নিষিদ্ধ এমন বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব তারা প্রকাশ্যে কীভাবে করেন তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

প্রচলিত আইনে জুয়া নিষিদ্ধ থাকলেও কীভাবে এসব তারকারা প্রকাশ্যে জুয়ার সাইটগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে একাধিক আইনজীবী জানান, দেশে জুয়া সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইনে কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। আর এসব ফাঁকফোকরকে তারা নেগেটিভভাবে ব্যবহার করছে। তাদের নৈতিকতাকে দেশের আইন বিরোধী কার্যকলাপের কাছে বিক্রি করা মোটেও শোভনীয় নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।

সাইম হোসেন নামে এক যুবক দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, আমি এবারের আইপিএলে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো নষ্ট করেছি। এটা একটা নেশার মতো। একবার কেউ জড়িয়ে পড়লে টাকার মায়ায় আর বের হতে পারে না। 

কীভাবে এমন অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়লেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রায় সময় ফেসবুকে প্রবেশ করলেই এসব অ্যাপসের বিজ্ঞাপন দেখতাম। তারপর দেখলাম সেখানে আমাদের দেশের অনেক পরিচিত মুখ রয়েছে। এসব দেখে বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। এখন অনেক টাকা ঋণ হওয়ার পরে বুঝতে পারছি এসব জুয়া কতটুকু ক্ষতিকর।

হামিদ মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি জানান, দুই তিন বছর যাবৎ তিনি নিষিদ্ধ ব্যাটিং অ্যাপসের মাধ্যমে জুয়া খেলে আসছেন। খেলোয়াড় এবং শোবিজ তারকাদের বিজ্ঞাপন দেখে তার মনে বিশ্বাস জন্ম নেয়। কিন্তু একটা সময় তিনি বুঝতে পারেন যে এটি অন্যায়। কিন্তু আগে অনেক টাকা এই জুয়ায় খোয়া গেছে। ফলে সেখান থেকে বের হতে পারছেন না।

জানা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ এর সংবিধানে জুয়া খেলা নিরোধ করা হয়। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা’ নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও জুয়া খেলা অবৈধ। কিন্তু এ আইন ১৮৬৭ সালে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এবং এতে সাজার পরিমাণও খুব নগণ্য।

পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট অনুযায়ী, যেকোনো ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনও সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এ রকম কোনো ঘরে তাস, পাশা, কাউন্টার বা যেকোনো সরঞ্জামসহ কোনো ব্যক্তিকে জুয়া খেলারত বা উপস্থিত দেখতে পাওয়া গেলে তিনি এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

ঢাকা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মোস্তাফিজ আলী পীর দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, আমরা এখন দেখতে পাই দেশের বড় বড় কিছু তারকা নিষিদ্ধ ব্যাটিং অ্যাপসের সাথে যুক্ত হচ্ছেন। এটি আমাদের দেশ এবং যুব সমাজের জন্য মোটেও ভালো দিকের ইঙ্গিত বহন করে না। লোভনীয় টাকার অফারের কাছে তারা আদর্শকে বিক্রি করে ফেলছেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, দেশের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা শোবিজ তারকাদের ফলো করে। আইনের কিছু ফাঁক ফোকরকে কাজে লাগিয়ে তারা অসৎপন্থায় কাজ করছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুজা আল ফারুক দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, বিষয়টি আমরাও অনেকদিন যাবত শুনে আসছি। সংবাদটি যদি সত্যি হয় তাহলে এটা বলা যেতে পারে শোবিজ অঙ্গনের এসব তারকা জুয়া নিয়ে, আইনের বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক জ্ঞাত। নাহলে প্রকাশ্যে তারা কীভাবে নিষিদ্ধ সাইটের হয়ে কাজ করেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, সেলিব্রেটিরা সমাজে তরুণদের আইডল হিসেবে কাজ করেন। তাদের কথাগুলো যুবসমাজে খুবই গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফলে জুয়ার সাইটগুলো সেসব তারকাদের বেছে নিয়েছে যাদের জনপ্রিয়তা বেশি। যুব সমাজের বড় একটি অংশ কোনো যাচাই বাছাই না করে এতে জড়িয়ে পড়ে।

এ সময় তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় শুভেচ্ছাদূত হিসাবে যারা কাজ করছেন তারা বিজ্ঞ কোনো আইন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েই কাজ করছেন। কারণ তারা জানছেন, দেশের প্রচলিত আইনে জুয়া নিয়ে অনেক ফাঁক ফোকর রয়েছে। ফলে তারা কোনো না কোনো উপায়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, এর আগে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ এমন সাইটের বিজ্ঞাপন ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নাম জড়িয়েছিলেন জয়া আহসান, অপু বিশ্বাস ও নুসরাত ফারিয়া। এর মধ্যে জয়া ও ফারিয়াকে শুধু বিজ্ঞাপনে পাওয়া গেলেও অপু কাজ করেছেন শুভেচ্ছাদূত হিসেবে। পরে তাঁরা জানান, ভুল তথ্যে এগুলোতে জড়িয়ে পড়েছেন।