দেশের সরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করা হলেও সব অর্থ নির্ধারিত সময়ে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে জমতে জমতে অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বিপুল অঙ্কে। এর মধ্যে এমন খাতও রয়েছে, যার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অথচ এসব খাতের নামেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ এর বড় উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৩-৯৪ সালে। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় ছাত্র সংসদ খাতে ৫০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই খাতে জমা হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮ টাকা। এর বাইরে তপশিলভুক্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা আরও ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার ৯৯২ টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
ইডেন কলেজেও নব্বইয়ের দশকে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে ভর্তির সময় ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া না হলেও প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে এ খাতে আগে জমা হওয়া ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০৮ টাকা পড়ে আছে। তপশিলভুক্ত অন্যান্য খাতে অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ আরও ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০ টাকা।
মফস্বলের সরকারি কলেজগুলোর চিত্রও প্রায় একই। নোয়াখালী সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৬ লাখ ৭ হাজার ৮৪৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৭ হাজার ৭৮০ টাকা দীর্ঘদিন ধরে অব্যয়িত রয়েছে।
শুধু এই তিনটি প্রতিষ্ঠান নয়, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন সরকারি স্কুল-কলেজের তহবিলে এমন অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ব্যাংক হিসাবে পড়ে থাকা এসব অর্থ এবার সরকারি কোষাগারে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন বিভিন্ন সরকারি স্কুল-কলেজের প্রধানরা।
২০ কলেজেই শতকোটি টাকার বেশি
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে বড় ২৮টি কলেজের কাছে অব্যয়িত অর্থের হিসাব চাওয়া হয়। এর মধ্যে ২০টি কলেজের হিসাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া ওই হিসাব অনুযায়ী, এসব ২০ কলেজে ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই খাতে আদায় করা ১০ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭২ টাকা ব্যয় হয়নি। একই সময়ে তপশিলভুক্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা আরও ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। অর্থাৎ শুধু ২০টি কলেজেই অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবের আওতায় এলে অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়াকে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কোন কলেজে কত টাকা
প্রাপ্ত হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৬ লাখ ৫১ হাজার ৩৭২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ২৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৯ টাকা পড়ে আছে। কবি নজরুল সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৮ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৩ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৬ টাকা অব্যয়িত।
রংপুরের সরকারি কারমাইকেল কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১ কোটি ২৩ লাখ ২১৯ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৮ টাকা জমা রয়েছে। রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে এই দুই খাতে অব্যয়িত অর্থ যথাক্রমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৬ টাকা ও ৩ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৪৮ টাকা।
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৬০ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮৫ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬৪ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। খুলনার সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯১ হাজার ৪৭২ টাকা জমা আছে।
রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ২২ লাখ ২১ হাজার ৮৮৫ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯০ হাজার ৩৫৫ টাকা রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৮ লাখ ৭৪২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৪ টাকা অব্যয়িত।
বাগেরহাটের সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯০ টাকা খরচ করা হয়নি।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৬ কোটি ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৫১৭ টাকা পড়ে আছে।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৪৩ লাখ ১১ হাজার ১২৪ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে এই দুই খাতে রয়েছে যথাক্রমে ১০ লাখ ২ হাজার ২০৩ টাকা ও ৫ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩০৯ টাকা।
পিরোজপুরের সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৯ লাখ ২০ হাজার ৯৫৫ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৭ টাকা অব্যয়িত। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৭৪৭ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৪ টাকা পড়ে আছে।
নোয়াখালী সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৫৩০ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার ২০১ টাকা ব্যয় হয়নি। নেত্রকোনা সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৬ লাখ ৭ হাজার ৪৪৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৭৮০ টাকা রয়েছে।
এ ছাড়া জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৯ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৭৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৯ টাকা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে জমা রয়েছে।
ভর্তির সময় নেওয়া হয় ২৫-৩০ ধরনের ফি
খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার সময় কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি খাতে ফি নেওয়া হয়। এসব খাতের সব অর্থ প্রতিবছর ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
কোনো বছর ক্রীড়া আয়োজন না হলে ওই খাতের টাকা থেকে যায়। বিজ্ঞান মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না হলেও সংশ্লিষ্ট অর্থ জমা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসবাবপত্র মেরামত, শিক্ষা সফর কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কার্যক্রমের প্রয়োজন দেখা দিলে কয়েক বছর জমে থাকা অর্থ একসঙ্গে ব্যয় করা হয়।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বক্তব্য, এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ না থাকায় কোনো কোনো অর্থ দীর্ঘদিন অব্যয়িত থেকে যায়। তাদের মতে, এই অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে। তাই সরকারি কোষাগারে নিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করা উচিত।
সরকারি হিসাবে অব্যয়িত অর্থের বিশাল অঙ্ক
সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২৪ অনুযায়ী, দেশে একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪টি। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ৬৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৮ হাজার ১০৩ জন।
দেশে কলেজের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬২টি। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ৬৪২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৬ শিক্ষার্থী।
মাউশির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ নেওয়া হলেও সব খাতের টাকা প্রতিবছর খরচ করা সম্ভব হয় না। আবার বিধি অনুযায়ী এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগও নেই। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ অব্যয়িত পড়ে আছে।
তিনি বলেন, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অডিটের সময় এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সরকার অব্যয়িত অর্থ কোষাগারে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আপত্তি
রাজধানীসহ দেশের অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা আপত্তি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, ভর্তি ও বেতন বাবদ আদায় করা অর্থের একটি অংশ সরকার পায় এবং বাকি অংশ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ফান্ডে থাকে। এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম ও হিসাবরক্ষণ থাকায় নয়ছয়ের সুযোগ নেই। বরং বিভিন্ন খাতে কোনো বছর ব্যয় কম হলে সেই অর্থ পরবর্তী বছর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করা হয়।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা আরও জানান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে জনবল কাঠামোর বাইরে খণ্ডকালীন শিক্ষক বা কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হয়। এসব ব্যয় অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকেই বহন করতে হয়। এ ছাড়া জরুরি মেরামত, শিক্ষা সফর, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ বিভিন্ন খাতে হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
তাদের মতে, সরকার যদি পুরো অর্থ নিয়ে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে জরুরি প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়বে।
করোনা ও গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব
প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কেউ কেউ বলেন, করোনাকালে কয়েক বছর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ নানা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেও অনেক পরিকল্পিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বেশ কিছু খাতের টাকা খরচ না হয়ে জমে গেছে।
রাজধানীর শতবর্ষী একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন বর্তমানে হচ্ছে না। ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে ছাত্র সংসদের নেতারা যদি আগের ফান্ডের অর্থের হিসাব চান, তখন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে তার জবাব দিতে হবে। তাই এখনই ছাত্র সংসদের নামে জমা থাকা অর্থ সরকারি কোষাগারে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, প্রতিবছর ক্রীড়া, সংস্কৃতি কিংবা বিজ্ঞান খাতে অর্থ নেওয়া হলেও সব বছর একই ধরনের আয়োজন করা যায় না। কোনো কোনো সময় দুই-তিন বছর পর বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়। তখন আগের বছরগুলোর জমা অর্থ ব্যবহার করা হয়।
নীতিমালার দাবি
অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার দাবিতে নবগঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত সাত কলেজসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে একাধিক দফায় আলোচনা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম ইলিয়াস বলেন, ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে আগের জমা থাকা অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে নিতে চায় এবং বিষয়টি তদারক করা হচ্ছে।
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় অব্যয়িত অর্থ জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। পরে অধ্যক্ষরা একসঙ্গে ঢাকা অডিট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছেন।
তার ভাষ্য, কোনো বছর ফান্ডের টাকা ব্যয় করা সম্ভব না হলে পরবর্তী বছর তা ব্যবহার করা হয়। আবার কোনো বছর কম অর্থ আদায় হলে আগের বছরের অর্থ থেকেও প্রয়োজন মেটানো হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই তারা মেনে নেবেন।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ মূলত তাদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়। করোনা ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কারণে কিছু অর্থ ব্যয় হয়নি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকাকালে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ফান্ডে থোক বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল, সেটিও পুরোপুরি ব্যয় করা হয়নি।
ঢালাওভাবে নয়, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার পরামর্শ
মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আজাদ খান বলেন, সব অর্থ প্রতিবছর ব্যয় করা সম্ভব হয় না। সরকার যদি পুরো অর্থ নিয়ে নেয়, তাহলে বিশেষ করে ছোট স্কুল-কলেজগুলো সমস্যায় পড়বে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং জরুরি প্রয়োজনে সেখান থেকেই ব্যয় করতে হয়।
তার মতে, বড় কলেজগুলোর আয় বেশি হওয়ায় তাদের ফান্ডেও তুলনামূলক বেশি অর্থ জমে। সেখান থেকে একটি অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের অর্থ একসঙ্গে নিয়ে না গিয়ে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। সরকার অব্যয়িত অর্থ কোষাগারে নিতে চাইছে, আর প্রতিষ্ঠানগুলো তা নিজেদের ফান্ডে রাখতে চায়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে জনবল কাঠামোর বাইরে খণ্ডকালীন লোক নিয়োগের প্রয়োজন হয়। তাদের পারিশ্রমিক অনেক সময় এসব ফান্ড থেকেই দিতে হয়। আবার বিভিন্ন খাতে হঠাৎ ব্যয়ের প্রয়োজনও হতে পারে। ফলে সরকার পুরো টাকা নিয়ে নিলে প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়তে পারে।
তার পরামর্শ, অর্থ নিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ভিন্ন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো বছরের অব্যয়িত অর্থ সেই বছরই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অনেক প্রতিষ্ঠান তা করেনি।
তিনি বলেন, এ কারণে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য মাউশির মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ জমা না দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন—শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নেওয়া অর্থ যদি বছরের পর বছর ব্যয় না হয়, সেটি কি সরকারি কোষাগারে চলে যাবে, নাকি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কল্যাণে ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই থাকবে?
একদিকে সরকারের যুক্তি, অব্যয়িত অর্থ সরকারি হিসাবে ফেরত না আসায় রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এই অর্থ তাদের নিয়মিত কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয়ের সুযোগ রাখা উচিত।
এই দ্বন্দ্বের সমাধানে এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা—কোন অর্থ কতদিন অব্যয়িত রাখা যাবে, কোন পরিস্থিতিতে তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা যাবে এবং কোন অর্থ অবশ্যই সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। তা না হলে একদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে, অন্যদিকে হঠাৎ করে পুরো অর্থ তুলে নিলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন ও জরুরি কার্যক্রমেও তৈরি হতে পারে নতুন সংকট।