ইতালির ভেনিসে হামলা ও হেনস্তার শিকার হওয়ার পর নিজের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়েছেন অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধন। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর ফেসবুক লাইভে এসে তিনি জানান, এ ঘটনায় তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং হামলার ঘটনার শেষ না দেখে ভেনিস ছাড়বেন না বলে দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছেন।
ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, ঘটনার পর থেকে প্রচুর মানুষ তাকে ফোন করে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রচুর মানুষ আমাকে ফোন করছেন, আমার খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন-আমি কেমন আছি, কোথায় আছি, কীভাবে আছি? আমি শুধু আপনাদের সবাইকে বলতে চাই, আলহামদুলিল্লাহ, আমি ঠিক আছি। আমি আমার মাথা কখনো নত করিনি। আর সেটা করতে ভুলেও গেছি। তাই আমাকে ভেঙে ফেলা এত সহজ নয়।’
হামলার পর ইতালির স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতা পাওয়ার কথাও জানান বাঁধন। তার ভাষ্য, ঘটনার পর পুলিশ তাকে নিরাপদ একটি স্থানে নিয়ে যায়। পরে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
বাঁধন বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ এম্বেসি থেকে অ্যাম্বাসেডর সাহেব আমাকে ফোন করেছেন। তার অফিস থেকে লোক আসছে। তাদের সঙ্গে আমি থানায় যাচ্ছি কেস ফাইল করতে।’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান এই অভিনেত্রী। একই সঙ্গে হামলার পর যারা ফোন, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে তাকে সাহস ও সমর্থন জানিয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ঘটনার প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন বাঁধন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে সমস্ত প্রমাণ আছে এবং আমরা এরই মধ্যে কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছি।’
দেশের মানুষের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত বাঁধন বলেন, ‘প্রত্যেকটা মানুষ আমাকে যেভাবে সাপোর্ট করেছেন, গতকাল থেকে, ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর থেকে, আমি ভীষণভাবে আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি মনে করি, আমি একজন গর্বিত বাংলাদেশি। কারণ, আমার দেশের মানুষ আমার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। সেটার জন্য অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।’
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তার সক্রিয় অবস্থানের কারণেই ইতালিতে তাকে লক্ষ্য করে হামলা ও হেনস্তা করা হয়েছে। ফেসবুক লাইভে নিজের সেই অবস্থানের কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন তিনি।
বাঁধন বলেন, ‘আমি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, যেটা আমি মনে করি, আমার জীবনে নেওয়া কিছু সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি। আমি একজন গর্বিত জুলাই যোদ্ধা।’
ঘটনার পর অনেকেই তাকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে সাহস না হারানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের উদ্দেশে বাঁধন বলেন, ‘আমাকে সবাই একটা কথা বারবার বলছেন, সাহস হারাবেন না। বাঁধন সাহস হারানোর জন্য জন্মায়নি। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন, আমাকে ভয় দেখানো, আমাকে ভেঙে ফেলা এত সহজ নয়।’
তবে নিজের ওপর হামলার চেয়েও ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের হেনস্তার ঘটনায় বেশি ক্ষুব্ধ বাঁধন। বিশেষ করে ভাইয়ের স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুসন্তানের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, সেটিকে ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাঁধন বলেন, ‘আমার ভাই এবং তার পরিবার, তার ছোট বাচ্চা ও তার স্ত্রী যেভাবে হ্যারাজড হয়েছে, সেটার জন্য আমি মারাত্মকভাবে আপসেট।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার জন্য আমার ছোট ভাই এবং তার ওয়াইফ এবং তার তিন বছরের বাচ্চা যেভাবে অ্যাসল্টেড হয়েছে, সেটা ন্যক্কারজনক।’
ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত ভেনিস না ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বাঁধন বলেন, ‘আমি কেস ফাইল না করে ভেনিস থেকে বাংলাদেশে আসছি না। এটার শেষ আমি দেখে ছাড়ব।’
চলতি সপ্তাহে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার দলের সঙ্গে অংশ নেন বাঁধন। উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক অরিজন্তি বিভাগে জায়গা পেয়েছে সিনেমাটি। ৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনা থিয়েটারে সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়।
প্রিমিয়ারের পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুরতে বের হলে হামলা ও হেনস্তার শিকার হন বলে জানান বাঁধন। তার অভিযোগ, তাকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারা হয়। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি তার হাত থেকে মুঠোফোনও ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় তার ভাইয়ের স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুসন্তানও সঙ্গে ছিলেন।
বাঁধনের আরও অভিযোগ, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
এ ঘটনার পর বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের অনেক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবাদ ও সমর্থনের বার্তা এসেছে। অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার শেষ দেখে তবেই ভেনিস ছাড়ার কথা জানিয়েছেন বাঁধন।