শরৎচন্দ্র চাননি, তবু ১০০ বছর ধরে পর্দায় বেঁচে আছে ‘দেবদাস’

একটি প্রেমের গল্প। অথচ তার শেষ মিলনে নয়, বিচ্ছেদে। একটি চরিত্র—যে ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পাওয়ার মতো দৃঢ়তা দেখাতে পারে না। আর সেই অপূর্ণতার যন্ত্রণা ধীরে ধীরে তাকে ঠেলে দেয় আত্মবিনাশের দিকে।

এই গল্পই ‘দেবদাস’।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি। কিন্তু এর সবচেয়ে আশ্চর্যের দিক হলো—লেখক নিজেই একসময় মনে করেছিলেন, গল্পটি ছাপার উপযুক্ত নয়। এমনকি বন্ধুবর ও ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার অন্যতম কর্ণধার প্রমথনাথ ভট্টাচার্য যখন উপন্যাসটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, শরৎচন্দ্র নাকি তাঁকে বলেছিলেন—“নিও না, নেবার চেষ্টাও কোরো না। ওটা ইমমর‌্যাল।”

তবু প্রকাশক থামেননি। ১৯১৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর ‘দেবদাস’ ধীরে ধীরে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। এরপর প্রায় এক শতাব্দী ধরে গল্পটি বারবার ফিরে এসেছে মঞ্চে, সিনেমায় এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে।

বাংলা থেকে হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলুগু, অসমিয়া ও মালয়ালম—বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত হয়েছে ‘দেবদাস’। কখনও নির্বাক সিনেমা, কখনও সাদাকালো, কখনও রঙিন পর্দা। কখনও প্রমথেশ বড়ুয়া, কখনও দিলীপ কুমার, কখনও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বুলবুল আহমেদ কিংবা শাকিব খান। আর একসময় সেই চরিত্রে হাজির হন বলিউডের শাহরুখ খান।

প্রতিবারই গল্পটি বদলেছে, বদলায়নি তার মূল বেদনা।

যে গল্প ছাপতেই চাননি লেখক

‘দেবদাস’ লেখার পর শরৎচন্দ্র দীর্ঘ সময় সেটি প্রকাশ করেননি। প্রায় সাত বছর লেখা অবস্থায় পড়ে ছিল উপন্যাসটি। লেখকের নিজের কাছেই এটি খুব একটা পছন্দের ছিল না।

সাহিত্য সমালোচকদের একাংশও মনে করেন, শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় ‘দেবদাস’-এর সাহিত্যিক উৎকর্ষ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু পাঠকের কাছে এর জনপ্রিয়তা সেই প্রশ্নকে বহু আগেই অতিক্রম করেছে।

কারণ ‘দেবদাস’ শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়। এখানে রয়েছে সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, পারিবারিক অহং, পুরুষের দুর্বলতা, নারীর অসহায়তা, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং অপূর্ণ প্রেমের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা।

দেবদাস-পার্বতীর প্রেম তাই কেবল দুজন মানুষের প্রেম নয়; এটি সমাজের নানা অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যাওয়া এক সম্পর্কের গল্প।

১৯২৮: পর্দায় প্রথম দেবদাস

উপন্যাস প্রকাশের প্রায় এক দশক পর ১৯২৮ সালে প্রথমবার বড়পর্দায় আসে ‘দেবদাস’।

নরেশ মিত্রের পরিচালনায় তৈরি সেই ছবি ছিল নির্বাক। দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন ফণী বর্মা, পার্বতীর ভূমিকায় তারকবালা বসু এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে নীহারবালা সরকার।

এই ছবির এখন আর দর্শক হওয়া সম্ভব নয়। সময়ের নির্মমতায় ছবিটির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে।

তবু ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অমলিন। কারণ এখান থেকেই শুরু হয় ‘দেবদাস’-এর দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রা।

প্রমথেশ বড়ুয়া: তিন ভাষায় দেবদাস

১৯৩৫ সালে আসে প্রথম সবাক ‘দেবদাস’। নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় ছবিটি পরিচালনা করেন প্রমথেশ বড়ুয়া। নাম ভূমিকাতেও অভিনয় করেন তিনি। পার্বতীর চরিত্রে ছিলেন যমুনা বড়ুয়া এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় চন্দ্রাবতী দেবী।

ছবিটি ব্যাপক সাফল্য পায়।

কথিত আছে, শরৎচন্দ্র প্রথমে প্রমথেশ বড়ুয়াকেও ছবিটি বানাতে উৎসাহিত করেননি। কিন্তু পরিচালক শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজি করাতে সক্ষম হন।

এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া একই কাহিনি নিয়ে হিন্দি ও অসমিয়া ভাষাতেও সিনেমা তৈরি করেন।

১৯৩৬ সালের হিন্দি ‘দেবদাস’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন কিংবদন্তি গায়ক-অভিনেতা কুন্দনলাল সায়গল। পার্বতীর চরিত্রে আবারও ছিলেন যমুনা বড়ুয়া। চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় রাজকুমারী দেবী।

পরের বছর, ১৯৩৭ সালে, অসমিয়াতেও তৈরি হয় ‘দেবদাস’। দেবদাস চরিত্রে ফণী শর্মা, পার্বতী চরিত্রে জ়ুবেইদা এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় মোহিনী অভিনয় করেন।

প্রমথেশ বড়ুয়ার তিন ভাষার এই উদ্যোগ ‘দেবদাস’-কে আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর ভারতীয় চলচ্চিত্রের সম্পদে পরিণত করার পথ তৈরি করে।

দিলীপ কুমার: যে দেবদাস হয়ে গেলেন কিংবদন্তি

১৯৫৩ সালে তেলুগু ও তামিল ভাষায় ‘দেবদাস’ নির্মিত হয়। কিন্তু দুই বছর পর, ১৯৫৫ সালে, হিন্দি চলচ্চিত্রে এমন এক ‘দেবদাস’ এল, যা চরিত্রটির সঙ্গে একজন অভিনেতাকে প্রায় চিরস্থায়ীভাবে এক করে দেয়।

পরিচালক বিমল রায়।

দেবদাস—দিলীপ কুমার।

পার্বতী—সুচিত্রা সেন।

চন্দ্রমুখী—বৈজয়ন্তীমালা।

এই ছবিকে অনেক সমালোচক শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী চলচ্চিত্ররূপগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।

দিলীপ কুমারের অভিনয়ে দেবদাস হয়ে ওঠে আরও গভীর, আরও বিষণ্ণ, আরও আত্মবিধ্বংসী। তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপ বলার ধরন এবং চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব দর্শকদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

মজার বিষয়, বিমল রায়ের এই ছবির সঙ্গে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’-এরও একটি যোগসূত্র ছিল। ১৯৩৬ সালের প্রমথেশের হিন্দি ‘দেবদাস’-এর ক্যামেরাম্যান ছিলেন বিমল রায়।

সুচিত্রা ও বৈজয়ন্তীমালার গল্প

পার্বতীর চরিত্রে প্রথমে ভাবা হয়েছিল মীনা কুমারীকে। কিন্তু কিছু শর্ত নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিমল রায় একজন বাঙালি অভিনেত্রীকে বেছে নেন—সুচিত্রা সেন।

অন্যদিকে চন্দ্রমুখীর চরিত্রে প্রথমে নার্গিস এবং পরে সুরাইয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। দুজনেই দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয়ে রাজি হননি।

শেষ পর্যন্ত উঠতি তারকা বৈজয়ন্তীমালা চরিত্রটি গ্রহণ করেন।

ফলে ‘দেবদাস’-এর ইতিহাসে তৈরি হয় এমন এক ত্রয়ী, যাদের নাম আজও একসঙ্গে উচ্চারিত হয়—দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন ও বৈজয়ন্তীমালা।

যুদ্ধের মাঝেও সীমান্ত পেরোয় প্রেম

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বছরেই পাকিস্তানে উর্দু ভাষায় নির্মিত হয় ‘দেবদাস’।

পরিচালক খাজা সরফরাজ। দেবদাস চরিত্রে হাবিব তালিশ, পার্বতীর ভূমিকায় শামিম আরা এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে নায়ার সুলতানা।

যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেও শরৎচন্দ্রের প্রেম ও বিরহের গল্প সীমান্ত পেরিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। ছবিটি পাকিস্তানে মোটামুটি সাফল্য পায় এবং শামিম আরার অভিনয় প্রশংসিত হয়।

এখানেই ‘দেবদাস’-এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—এটি কোনো একটি ভাষা বা দেশের গল্প হয়ে থাকেনি। ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় গল্পটি বারবার নতুন অর্থ পেয়েছে।

সৌমিত্র-উত্তমের ‘দেবদাস’, তবু দর্শকের মন ভরেনি

১৯৭৯ সালে বাংলায় আবার তৈরি হয় ‘দেবদাস’। পরিচালক দিলীপ রায়।

দেবদাস চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পার্বতীর চরিত্রে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় সুপ্রিয়া চৌধুরী। আর চুনিলালের চরিত্রে ছিলেন উত্তমকুমার।

তারকাখচিত এই ছবিকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল বিপুল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি বাঙালি দর্শকের মনে আগের ‘দেবদাস’-এর মতো জায়গা করে নিতে পারেনি।

বিশেষ করে সৌমিত্রের দেবদাসকে দর্শকের একাংশ সহজে গ্রহণ করতে পারেননি। যেন আগের পর্দার দেবদাসদের ছায়া এতটাই শক্তিশালী ছিল যে নতুন কাউকে সেই জায়গায় বসানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশে ‘দেবদাস’: বুলবুল থেকে শাকিব

বাংলাদেশেও ‘দেবদাস’ পেয়েছে বিশেষ জীবন।

১৯৮২ সালে পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন বাংলা ‘দেবদাস’। দেবদাস চরিত্রে বুলবুল আহমেদ, পার্বতীর ভূমিকায় কবরী এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে আনোয়ারা অভিনয় করেন।

বাংলাদেশে ছবিটি ব্যাপক সাফল্য লাভ করে।

তিন দশক পর চাষী নজরুল ইসলাম আবারও ফিরে যান একই গল্পে। ২০১৩ সালে নির্মিত নতুন ‘দেবদাস’-এ দেবদাস হন শাকিব খান, পার্বতী অপু বিশ্বাস এবং চন্দ্রমুখী মৌসুমী।

ছবিটি দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে এবং তিন অভিনেতার অভিনয়ও প্রশংসিত হয়।

অর্থাৎ, শরৎচন্দ্রের লেখা একটি গল্প দুই বাংলায় ভিন্ন সময়ের দুই প্রজন্মের অভিনেতাকে দিয়ে নতুন করে জীবন্ত হয়েছে।

শাহরুখের দেবদাস: প্রেম থেকে মহাকাব্যিক জাঁকজমক

২০০২ সালে ‘দেবদাস’ আবারও ভারতীয় সিনেমার আলোচনার কেন্দ্রে আসে।

এবার পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভন্সালী। দেবদাস—শাহরুখ খান। পার্বতী—ঐশ্বর্যা রায় বচ্চন। চন্দ্রমুখী—মাধুরী দীক্ষিত।

এই ‘দেবদাস’ আগের ছবিগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করে। বিশাল সেট, চোখধাঁধানো পোশাক, আলো, নাচ, গান—সবকিছু মিলিয়ে শরৎচন্দ্রের বিষণ্ণ প্রেমকাহিনি হয়ে ওঠে এক মহাকাব্যিক বলিউড spectacle।

শাহরুখ নিজেই জানিয়েছিলেন, প্রথমে তিনি চরিত্রটি করতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, দেবদাসের জন্য তিনি উপযুক্ত নন। কিন্তু ভন্সালীর অনড় অবস্থানের কাছে শেষ পর্যন্ত রাজি হন তিনি।

আর একটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছিলেন শাহরুখ—দেবদাসের মতো পুরুষ চরিত্র তাঁর বিশেষ পছন্দের নয়।

তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর অভিনীত দেবদাসই চরিত্রটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পৌঁছে দেয়।

একই বছরে আরেক বাংলা ‘দেবদাস’

২০০২ সালেই কলকাতায় নির্মিত হয় আরেকটি বাংলা ‘দেবদাস’।

শক্তি সামন্ত পরিচালিত ছবিতে দেবদাসের ভূমিকায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পার্বতী অর্পিতা পাল এবং চন্দ্রমুখী ইন্দ্রাণী হালদার। চুনিলালের চরিত্রে অভিনয় করেন তাপস পাল।

তবে ছবিটি বক্স অফিসে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি।

এখানে যেন আবারও ফিরে আসে সেই পুরোনো প্রশ্ন—‘দেবদাস’ কি শুধু গল্পের নাম, নাকি এর সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু মুখ ও অভিনয়ও দর্শকের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে গেছে?

দেবদাস থেকে ‘দেব ডি’

২০০৯ সালে অনুরাগ কাশ্যপ শরৎচন্দ্রের গল্পকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ে এনে নির্মাণ করেন ‘দেব ডি’।

অভয় দেওল, মাহি গিল ও কল্কি কেঁকলা অভিনীত ছবিটি ছিল আধুনিক সময়ের ‘দেবদাস’-এর নতুন ব্যাখ্যা। প্রেম, যৌনতা, আসক্তি, সম্পর্কের ভাঙন এবং আত্মধ্বংস—সবকিছুই সেখানে সমসাময়িক নগরজীবনের ভাষায় হাজির হয়।

মূল কাহিনির আবেগ ধরে রেখে গল্পকে নতুন সামাজিক বাস্তবতায় বসানো হয়েছিল। ফলে ‘দেবদাস’ প্রমাণ করে, এটি শুধু একটি পুরোনো উপন্যাস নয়; সময় বদলালেও গল্পটির মূল দ্বন্দ্ব নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে বলা সম্ভব।

পাকিস্তানে ফিরে আসে আবারও

পাকিস্তানেও ‘দেবদাস’ থেমে থাকেনি।

২০১০ সালে সেখানে একটি নতুন সংস্করণ তৈরি হলেও অর্থসংকটে সেটি মুক্তি পায়নি। পরে ২০১৫ সালে ইকবাল কাশ্মীরির পরিচালনায় আরেকটি ‘দেবদাস’ করাচি ও লাহৌরে মুক্তি পায়।

দেবদাস চরিত্রে নাদিম শাহ, পার্বতী জারা শেখ এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে মীরা অভিনয় করেন। ছবির গানে ছিলেন আশা ভোসলে, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা যাজ্ঞিক, সোনু নিগম ও শ্রেয়া ঘোষালের মতো শিল্পীরা।

তবে এই সংস্করণ বক্স অফিসে সফল হয়নি।

কেন বারবার ফিরে আসে ‘দেবদাস’?

প্রায় একশো বছরে এত ভাষায়, এত অভিনেতা-অভিনেত্রী, এত পরিচালক ‘দেবদাস’ নিয়ে কাজ করেছেন। তবু গল্পটির আবেদন কমেনি।

কারণ সম্ভবত এর কেন্দ্রে রয়েছে অপূর্ণতা।

দেবদাস ও পার্বতী একে অপরকে ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। সামাজিক অবস্থান, পরিবার, অহং এবং সিদ্ধান্তহীনতা তাদের আলাদা করে দেয়।

পার্বতী অন্যের ঘরে চলে যায়। দেবদাস নিজের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আর চন্দ্রমুখী—যে দেবদাসকে ভালোবাসে—সেও তার হৃদয়ের দরজা পুরোপুরি খুলে দিতে পারে না।

এই ত্রিভুজের মধ্যে প্রেমের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিরহ।

আর এখানেই ‘দেবদাস’-এর সিনেমাটিক শক্তি।

মিলন ঘটলে কি হারিয়ে যেত ‘দেবদাস’?

বিভিন্ন সময়ে নির্মাতাদের কেউ কেউ নাকি দেবদাস ও পার্বতীর মিলন ঘটানোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু প্রযোজকদের আপত্তি ছিল—এই মিলন হয়তো গল্পটির মূল আকর্ষণই নষ্ট করে দেবে।

সেই আশঙ্কা অমূলক ছিল না।

কারণ ‘দেবদাস’-এর দর্শক শেষ পর্যন্ত তাদের মিলন দেখতে চান না; বরং তাদের না-মেলার বেদনার মধ্যেই গল্পের সৌন্দর্য খুঁজে পান।

যে মুহূর্তে দেবদাস পার্বতীর বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে যায়, অথচ তাকে আর নিজের করে নিতে পারে না—সেই অপূর্ণতাই চরিত্রটিকে অমর করে দিয়েছে।

শরৎচন্দ্রের ‘ইমমর‌্যাল’ গল্পের অমর যাত্রা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয়তো ভেবেছিলেন, ‘দেবদাস’ ছাপার মতো গল্প নয়। হয়তো তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, গল্পটির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু পাঠক সেই গল্পকে গ্রহণ করেছেন অন্যভাবে।

তারপর চলচ্চিত্র নির্মাতারা আবিষ্কার করেছেন—এই গল্পের মধ্যে এমন এক আবেগ রয়েছে, যা সময় ও ভাষার সীমা মানে না।

১৯২৮-এর নির্বাক পর্দা থেকে ১৯৩৫-এর প্রমথেশ বড়ুয়া, ১৯৫৫-এর দিলীপ কুমার, ১৯৭৯-এর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ১৯৮২-এর বুলবুল আহমেদ, ২০০২-এর শাহরুখ খান, ২০১৩-এর শাকিব খান—প্রতিটি প্রজন্ম নিজের মতো করে দেবদাসকে দেখেছে।

কেউ তাকে দেখেছে ব্যর্থ প্রেমিক হিসেবে, কেউ আত্মবিধ্বংসী পুরুষ হিসেবে, কেউ সামাজিক ব্যবস্থার শিকার হিসেবে। আবার কেউ দেখেছে এমন এক মানুষ হিসেবে, যে নিজের সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য নিজেই দিয়েছে।

প্রায় একশো বছর পরেও তাই প্রশ্নটি থেকে যায়—দেবদাস কি কেবল একজন মানুষ, নাকি অসমাপ্ত ভালোবাসার প্রতীক?

সম্ভবত দ্বিতীয়টিই সত্যি।

কারণ মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, সিনেমার ভাষা বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু ভালোবাসা হারানোর ভয়, প্রিয় মানুষকে হারানোর যন্ত্রণা আর অপূর্ণ প্রেমের দীর্ঘশ্বাস—এসব বদলায় না।

আর সেই কারণেই শরৎচন্দ্রের অনিচ্ছায় জন্ম নেওয়া ‘ইমমর‌্যাল’ গল্পটি আজও বারবার ফিরে আসে। কখনও ফণী বর্মার মুখে, কখনও প্রমথেশ বড়ুয়ার চোখে, কখনও দিলীপ কুমারের বিষণ্ণতায়, কখনও শাহরুখ খানের উন্মাদনায়—আর প্রতিবারই নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে দেবদাস।