অ্যাটোনমেন্ট: ইরাক যুদ্ধের অবিশ্বাস্য গল্প নিয়ে সিনেমা

যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার ক্ষত থেকে যায় বহু বছর। কখনো সেই ক্ষত শরীরে, কখনো মনে। আবার কখনো এমন এক সম্পর্কের ভেতর, যেখানে একদিকে হারানো স্বজনের শোক, অন্যদিকে সেই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে থাকা মানুষের অপরাধবোধ। নতুন ছবি ‘অ্যাটোনমেন্ট’ ঠিক এমনই এক সত্য ঘটনা থেকে তৈরি; ইরাক যুদ্ধের একটি মর্মান্তিক ঘটনা এবং প্রায় এক দশক পর ঘটে যাওয়া এক অসম্ভব সাক্ষাতের গল্প।

ছবিটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন রিড ভ্যান ডাইক। এতে অভিনয় করেছেন কেনেথ ব্রানা, হিয়াম আব্বাস ও বয়েড হলব্রুক। ছবির গল্পের কেন্দ্রে আছে ইরাকের বাগদাদে নিহত একটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেই মার্কিন মেরিনের সাক্ষাৎ, যিনি ওই হামলার সময় গুলি চালিয়েছিলেন।

গল্পের শুরু ২০০৩ সালের এপ্রিলে। বাগদাদে বাড়ি ফিরছিল একটি পরিবার। সে সময় মার্কিন মেরিন ও ইরাকি বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি চলছিল। দুই পক্ষের গুলির মাঝখানে পড়ে যায় পরিবারটি। ঘটনাটিতে নিহত হন পরিবারের তিন পুরুষ-স্বামী জেমস এবং দুই ছেলে নিকোলাস ও এডমন্ড। পরিবারের আরেক সদস্য নোরা কাচাদুরিয়ান কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন।

প্রায় ১০ বছর পর, ঘটনাটির বেঁচে যাওয়া দুই নারী-মার্গারেট ও তার মেয়ে নোরা-যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লেনডেলে বসবাস করছিলেন। সেখানেই একদিন তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান সেই মার্কিন মেরিন, লু লোবেলো। তার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমা চাওয়া।

এই অসাধারণ সাক্ষাতের ঘটনা প্রথম বিস্তারিতভাবে উঠে আসে সাংবাদিক ডেক্সটার ফিলকিন্সের ২০১২ সালের দ্য নিউ ইয়র্কার-এর প্রতিবেদন ‘আটোনমেন্ট আফটার ইরাক’-এ। লোবেলো ফিলকিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ফেসবুকের মাধ্যমে। প্রায় এক দশক ধরে তিনি ওই সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল কাচাদুরিয়ান পরিবারের কাছে পৌঁছানো এবং নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া। এমনকি ফিলকিন্সকে তিনি বলেছিলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো তার ‘পিটিএসডি’বা যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক যন্ত্রণাও কিছুটা লাঘব হবে।

ফিলকিন্স এর আগে ইরাকে কাচাদুরিয়ান পরিবারের ওপর প্রতিবেদন করেছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন। তবে লোবেলো এরই মধ্যে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিবারটির সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি ফিলকিন্সের সাহায্য চাইলেন, যেন তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সেতু হয়ে দাঁড়ান। অবাক করার মতো বিষয়, মার্গারেট ও নোরা তার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলেন।

মার্গারেট বলেছিলেন, লোবেলো যদি ক্ষমা চান, তারা তাকে ক্ষমা করবেন। কারণ, ঈশ্বর মানুষকে ক্ষমা করতে বলেছেন। যিনি তাদের প্রিয়জনদের হত্যা করেছেন, তাকেও। ২০১২ সালের জুলাইয়ের এক শনিবার সেই বহু প্রতীক্ষিত সাক্ষাৎ হয়। লোবেলো ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। মার্গারেট ও নোরার সামনে পৌঁছেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মার্গারেট তখন তাকে সান্ত্বনা দেন।

এরপর শুরু হয় কঠিন এক কথোপকথন। সেখানে ছিল শোক, অপরাধবোধ, ক্ষোভ, প্রশ্ন এবং ক্ষমার চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। অতীতও মুছে যায়নি। তবে একটি দরজা খুলেছিল; মানুষে মানুষে যোগাযোগের দরজা। কয়েক দিন পর নোরা লোবেলোকে ফেসবুকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি জানান, লোবেলো তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসায় তার ভালো লেগেছে। এমনকি তাকে তিনি ‘তৃতীয় ভাই’ এবং নিজের মায়ের ‘তৃতীয় ছেলে’ হিসেবে অনুভব করছেন বলেও জানান।

ভ্যান ডাইকের ছবিতে অবশ্য চরিত্রগুলোর নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। ডেক্সটার ফিলকিন্স হয়ে গেছেন মাইকেল রিড, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন কেনেথ ব্রানা। মার্গারেটের নাম হয়েছে মারিয়াম খাচাতুরিয়ান, চরিত্রটি করেছেন হিয়াম আব্বাস। আর লু লোবেলো হয়েছেন লু ডি’আলেসান্দ্রো, যার ভূমিকায় বয়েড হলব্রুক। ২০১২ সালে ফিলকিন্সের প্রতিবেদনটি প্রথম পড়েছিলেন ভ্যান ডাইক। তখন তিনি ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকে। প্রতিবেদনটি পড়ে তিনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন যে তার মনে হয়েছিল, ঘটনাটি নিয়ে একটি অসাধারণ চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব।

কিন্তু তখন সেই ছবি বানানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। কয়েক বছর পর তার ক্যারিয়ারে আসে বড় পরিবর্তন। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ডিকালব এলিমেন্টারি’ অস্কারে সেরা লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্মের পুরস্কার জেতে। এরপরই তিনি সেই পুরোনো নিউ ইয়র্কার সংখ্যাটি বের করে আবার পড়েন এবং ছবিটি তৈরির কাজ শুরু করেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনকে প্রায় দুই ঘণ্টার চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া। ভ্যান ডাইকের ভাষায়, প্রতিবেদনে যা ছিল, সেটি ছিল তার কাছে অসাধারণ বাস্তব উপাদান। কিন্তু প্রতিবেদনে যেসব ঘরে সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না, সেসব জায়গার গল্প তৈরি করার দায়িত্ব ছিল চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার।