গোবিন্দগঞ্জে ২০ অসচ্ছল নারীর হাতে বসুন্ধরা গ্রুপের সেলাই মেশিন

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ২০ জন অসচ্ছল নারীর হাতে সেলাই মেশিন এবং দুটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়েছে।

কাটাবাড়ী ইউনিয়নের জুগিয়াপাড়া এলাকার অনেক পরিবারই দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। স্বল্প আয়ের কারণে সন্তানদের শিক্ষা, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিবারগুলোর একজন কাজলী মার্ডে। ভ্যানচালক স্বামীর সীমিত আয়ে তিন মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় তাকে।

সেলাইয়ের কাজ জানা থাকলেও নিজের একটি মেশিন না থাকায় সেই দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারছিলেন না কাজলী। বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রশিক্ষণ শেষে বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া সেলাই মেশিন হাতে পেয়ে তিনি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল সেলাই করে আয় করে সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করার। এখন সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সংসারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে তিনি আশাবাদী।

কাজলীর মতো আরও কয়েকজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী এবং দরিদ্র পরিবারের নারীর জীবনেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এই উদ্যোগ।

সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা অডিটরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপকারভোগীদের হাতে সেলাই মেশিন ও গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও শুভসংঘের প্রধান ইমদাদুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান, গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু, থানা মহিলা দলের সভাপতি মঞ্জুরি আহমেদ, গোবিন্দগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হাদিসুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও সমাজসেবীরা।

অনুষ্ঠানে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, অসচ্ছল নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতেই এই কর্মসূচি। একজন নারী ঘরে বসেই আয় করতে পারলে পুরো পরিবার উপকৃত হবে। তিনি সেলাই মেশিনকে আয়ের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি উপহার হিসেবে দেওয়া গাছেরও যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের এই উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন তাঁদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ সময় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু বসুন্ধরা গ্রুপের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাঁরা বলেন, এই ধরনের কর্মসূচি সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করছে।

আদিবাসী নেত্রী এমিলি হেমব্রম বলেন, অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের পাশে খুব কম প্রতিষ্ঠানই দাঁড়ায়। বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের পাশে এসে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সহযোগিতায় অনেক পরিবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

সংগ্রাম পেরিয়ে স্বাবলম্বিতার পথে আবিনাদ:
একই কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের একজন আবিনাদ টপ্য। অটোরিকশাচালক স্বামীর সীমিত আয়ে দুই মেয়ের পড়াশোনা, শাশুড়ির চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় সামলাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হতো তাঁর পরিবারকে।

পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও প্রয়োজনীয় সুযোগের অভাবে কিছুই করতে পারছিলেন না তিনি। পরে বসুন্ধরা শুভসংঘের বিনামূল্যের সেলাই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে পোশাক তৈরির কাজ শিখে দক্ষতা অর্জন করেন। তবে নিজের সেলাই মেশিন না থাকায় কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না।

সম্প্রতি বসুন্ধরা শুভসংঘের পক্ষ থেকে একটি সেলাই মেশিন উপহার পাওয়ার পর তাঁর সেই বাধা দূর হয়েছে। আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় আবিনাদ টপ্য বলেন, শুধু একটি সেলাই মেশিন নয়, বসুন্ধরা শুভসংঘ তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে। এখন তিনি সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের আয় বাড়াতে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

অনুষ্ঠান শেষে উপকারভোগী নারীরা নতুন উদ্যমে সেলাই মেশিন ও গাছের চারা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ শুধু একটি উপহার নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল ও সম্মানজনক জীবনের নতুন সূচনা।