স্যাটেলাইটে ধারণ করা নতুন ছবিতে গ্রিনল্যান্ডের একটি হিমবাহ থেকে ম্যানহাটন দ্বীপের প্রায় সমান আয়তনের বিশাল একটি বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার কোপার্নিকাস সেন্টিনেল-১ মিশনের তোলা এসব ছবিতে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পিটারম্যান হিমবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
গত ৪ আগস্ট পিটারম্যান হিমবাহের ভাসমান বরফস্তরের প্রায় ২৯ বর্গমাইল বা ৭৫ বর্গকিলোমিটার অংশ মূল হিমবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পিটারম্যান হিমবাহ গ্রিনল্যান্ডের বিশাল বরফস্তরকে আর্কটিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ২০১২ সালের পর এটি পিটারম্যান হিমবাহ থেকে ভাসমান বরফ হারানোর সবচেয়ে বড় ঘটনা। একই সঙ্গে ২০২০ সালের পর আর্কটিক অঞ্চলে এটিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর হিমবাহ ও বরফস্তরের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। গত তিন দশকে অ্যান্টার্কটিকা প্রায় ৫ হাজার বর্গমাইল স্থলভিত্তিক বরফ হারিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলার গতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভাসমান বরফ গলে যাওয়ার কারণে সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে না। কারণ এই বরফ ইতোমধ্যে সমুদ্রের পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বরফের পরিমাণ কমে যাওয়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে হিমবাহ ও বিশাল বরফস্তরের পশ্চাদপসরণও দ্রুত হতে পারে।
তবে নেপালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে পাহাড়ি গিরিপথ ও সংকীর্ণ উপত্যকায় বরফ গলে সৃষ্ট পানির প্রবাহ দ্রুত নেমে আসায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের এই বরফখণ্ডের ক্ষেত্রে তেমন আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ এটি বিস্তৃত সমুদ্র এলাকায় ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ফলে এর বরফ গলে গেলেও নেপালের মতো সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়ে পানি দ্রুত নেমে এসে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।
পিটারম্যান হিমবাহে সর্বশেষ এই বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাই হয়তো শেষ নয়। হিমবাহের ভাসমান বরফস্তরে তৈরি হওয়া ফাটলগুলো ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ায় আরও দুটি বড় বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এগুলোর আয়তন আনুমানিক ৯৭ ও ৮৭ বর্গকিলোমিটার হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিংয়ের গবেষক আনা ক্রফোর্ড মনে করেন, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বরফখণ্ডের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং আর্কটিক অঞ্চলের এসব বরফদ্বীপ নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে এসব বরফখণ্ড ভেঙে যাওয়ার ফলে হিমবাহের গতিশীলতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং সামুদ্রিক পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা বোঝা সম্ভব হবে।
ক্রফোর্ড বলেন, অ্যান্টার্কটিকাকে ঘিরে দক্ষিণ মহাসাগরে বিশাল সমতল বরফখণ্ড তুলনামূলকভাবে সাধারণ হলেও আর্কটিক অঞ্চলে এ ধরনের বরফদ্বীপ অনেক বেশি বিরল। তাই আর্কটিকের বরফখণ্ড নিয়ে গবেষণা থেকে পাওয়া জ্ঞান বিশ্বের অন্যান্য মেরু অঞ্চলের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের মতে, বরফস্তরের ভাঙন ও ক্ষয়ের প্রভাব শুধু মেরু অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু, হিমবাহের পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ভবিষ্যৎও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে পিটারম্যান হিমবাহের এই পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।