করাচির বন্দি হাতিদের মুক্তির দাবি

পাকিস্তানের করাচিতে বন্দিজীবন কাটানো আফ্রিকান হাতি মাধুবালাকে সুস্থ করে তুলতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাণী অধিকারকর্মী, পশুচিকিৎসক ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। গুরুতর অসুস্থতা, ওজন কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের অনুপযুক্ত পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে ২২ বছর বয়সী হাতিটি। তবে তার জীবনযাপনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন এখনো কাটেনি।

মাধুবালাকে ঘিরে এই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ অ্যালেন। ২০২৩ সালের ২২ এপ্রিল মারা যায় আরেক আফ্রিকান হাতি নূর জাহান। মৃত্যুর আগে হাতিটির শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তার চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সহায়তা করতে গিয়ে অ্যালেনের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।

বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অ্যালেন প্রাণীর পরিচর্যায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নূর জাহানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাকে চাকরি ছেড়ে প্রাণী কল্যাণের কাজে পুরোপুরি যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।

আল জাজিরাকে অ্যালেন বলেন, একদিন অসুস্থ হাতিটি তার ব্যথাক্লিষ্ট কপাল অ্যালেনের শরীরে ঠেকিয়েছিল। সেই মুহূর্তে হাতিটির সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা তিনি উপলব্ধি করেন।

নূর জাহানের মৃত্যুর পর বন্দি প্রাণীদের সুরক্ষায় ‘আই অ্যাম নূর জাহান’ আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর লক্ষ্য করাচিসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বন্দি বন্য প্রাণীদের উন্নত পরিচর্যা ও অধিকার নিশ্চিত করা।

২০০৯ সালে তানজানিয়া থেকে ধরে আনা চারটি আফ্রিকান হাতির বাচ্চাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি বন্য প্রাণী ব্যবসায়ীর মাধ্যমে হাতিগুলো আনা হয়েছিল।

চার হাতির মধ্যে নূর জাহান ও মাধুবালাকে রাখা হয় করাচি চিড়িয়াখানায়। অন্য দুই বোন সোনিয়া ও মালিকাকে নেওয়া হয় শহরের সাফারি পার্কে।

২০২০ সালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দীর্ঘ ৩৫ বছর বন্দি থাকা এশীয় হাতি কাভানের কম্বোডিয়ার একটি অভয়ারণ্যে স্থানান্তর আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। প্রাণী কল্যাণ সংস্থা ফোর পজের সহায়তায় কাভানকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনার পর করাচির হাতিদের অবস্থাও নতুন করে আলোচনায় আসে।

অ্যালেন ও অন্যান্য প্রাণী অধিকারকর্মী হাতিগুলোর উন্নত চিকিৎসা, খাবার এবং বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

২০২৪ সালের নভেম্বরে মাধুবালাকে করাচি চিড়িয়াখানা থেকে সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, তাকে বোন সোনিয়া ও মালিকার সঙ্গে একত্রে রাখা।

ফোর পজের মূল্যায়নে হাতিগুলোর উন্নত খাদ্য, চিকিৎসা এবং মানসিক উদ্দীপনামূলক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। পুনর্মিলনের সময় তিন হাতি শুঁড় দিয়ে একে অপরকে স্পর্শ করে এবং একসঙ্গে পানি পান করে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তাদের এই মিলন আশার সঞ্চার করেছিল।

কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সোনিয়া নিজের ঘেরের মধ্যে পড়ে গিয়ে মারা যায়। প্রথমে পার্ক কর্তৃপক্ষ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিল। পরে ফোর পজের প্রতিবেদনে পায়ের গভীর ফোড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কথা উঠে আসে।

সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত পশুচিকিৎসক আমির খলিলের মতে, এ ধরনের সংক্রমণ এক দিনে ছড়িয়ে পড়ে না। ফোর পজ সোনিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনুপযুক্ত পরিবেশ ও অপুষ্টির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে।

চার বোনের মধ্যে ইতিমধ্যে দুটির মৃত্যু হয়েছে। ফলে বাকি হাতি মাধুবালা ও মালিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

মাধুবালার শারীরিক অবস্থাও একসময় ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। সে ২০০ কেজির বেশি ওজন হারিয়েছিল। শুয়ে পড়ার পর নিরাপদে উঠে দাঁড়ানোও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

মাধুবালা ও মালিকা—দুই হাতিরই যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষায় মাধুবালার শরীরে আর যক্ষ্মার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে না বলে তার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

ফোর পজের পশুচিকিৎসক আমির খলিল আল জাজিরাকে বলেন, মাধুবালা তার হাঁটার সক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশ ফিরে পেয়েছে। চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলার ক্ষেত্রেও সে সহযোগিতা করছে।

তার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে ক্ষত পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং পায়ে উচ্চচাপের পানির সাহায্যে মালিশ। খলিল পাকিস্তান ছাড়ার আগে মাধুবালার ক্ষতগুলোর অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল বলেও জানান।

তবে সুস্থতার এই অগ্রগতি বজায় রাখতে নিয়মিত চিকিৎসা, সঠিক খাদ্য এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

মাধুবালার সঙ্গে অ্যালেনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ধৈর্য ও আস্থার মাধ্যমে। হাতিটিকে স্থানান্তরের জন্য বিশেষ পরিবহন খাঁচায় প্রবেশের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু স্থানান্তরে বিলম্ব হওয়ায় প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয় এবং মাধুবালা বিরক্ত হয়ে পড়েছিল বলে অ্যালেন জানান।

তখন তিনি ফুটবল দিয়ে হাতিটির মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করেন। অ্যালেনের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে মাধুবালাকে কাছে যাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে সে বলটি শুঁড় দিয়ে তুলে নিজের দুই পায়ের মাঝখানে লুকিয়ে রাখতে শুরু করে। পরিচর্যাকারীরা বলটি নিতে গেলে কখনো এগিয়ে দিত, আবার কখনো লুকিয়ে ফেলত।

এভাবে খেলার মাধ্যমে হাতিটির সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পরে মাধুবালা প্রশিক্ষণেও আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।

অ্যালেনের ভাষায়, মাধুবালার বিশ্বাস অর্জনই ছিল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

মাধুবালাকে সাফারি পার্কে স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ছিল তার জীবনযাপনের পরিবেশ উন্নত করা। কিন্তু অ্যালেনের অভিযোগ, সেখানে দর্শনার্থীরা হাতির খুব কাছে চলে যান, তাদের খাবার দেন এবং স্থানটিকে সাধারণ চিড়িয়াখানার মতো ব্যবহার করেন।

তার ভাষায়, যে জায়গাটি অভয়ারণ্য হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আবার চিড়িয়াখানায় পরিণত হয়েছে।

ফোর পজের তথ্য অনুযায়ী, সাফারি পার্কে হাতিদের জন্য নির্ধারিত ঘেরের আয়তন প্রায় ১৪ হেক্টর বা ৩৫ একর। তবে সিন্ধু প্রদেশের বন্য প্রাণীবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জাভেদ মাহের হাতিগুলোর জন্য গ্রামীণ এলাকায় কয়েক শ একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাহেরের মতে, করাচি চিড়িয়াখানাসহ পাকিস্তানের অধিকাংশ চিড়িয়াখানার পক্ষেই বন্য প্রাণীদের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করা কঠিন।

অন্যদিকে, করাচির মেয়র মুর্তজা ওয়াহাব বলেছেন, হাতিগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগে সেখানে আনা হয়েছিল। তাঁর দাবি, পশুচিকিৎসক ও ফোর পজের সহায়তায় মাধুবালার চিকিৎসায় করাচি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।

২০২০ সালে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রাণীদের অধিকার স্বীকার করেন। ওই রায়ের পর কাভানকে কম্বোডিয়ায় এবং দুটি হিমালয়ান ভালুককে জর্ডানের একটি অভয়ারণ্যে স্থানান্তরের পথ তৈরি হয়। ইসলামাবাদের চিড়িয়াখানাটি বন্ধ করে সেখানে থাকা ৮৭৮টি প্রাণীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা মুক্ত করা হয়েছিল।

আল জাজিরাকে বিচারপতি মিনাল্লাহ বলেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না হওয়ায় সেটি এখনো কার্যকর আইনগত নজির। তাঁর মতে, ওই আইনি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মাধুবালারও এমন পরিবেশে থাকার অধিকার রয়েছে, যেখানে তার সামাজিক, আচরণগত ও মানসিক চাহিদা পূরণ হবে।

পাকিস্তানে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকটও বাস্তব। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, দেশটির ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না। তবে প্রাণী কল্যাণকর্মীদের যুক্তি, বন্য প্রাণীকে বন্দি রাখার সিদ্ধান্ত নিলে তাদের খাবার, চিকিৎসা, চলাফেরা ও সঙ্গের প্রয়োজন পূরণের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বও নিতে হয়।

অ্যালেনের মতে, নূর জাহান ও সোনিয়াকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারত। সোনিয়ার ওজন কমে যাওয়া ও শরীরের নিচে ফোলা অংশ নিয়ে তিনি কর্তৃপক্ষকে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, সেই সতর্কতাগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

মাধুবালাকে সর্বশেষ ৮ অক্টোবর দেখেছিলেন অ্যালেন। তখন তিনি ফোর পজের চিকিৎসক দলের সঙ্গে কাজ করছিলেন। এখন মাধুবালার শারীরিক উন্নতি আশার আলো দেখালেও তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ধারাবাহিক চিকিৎসা, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং উপযুক্ত আবাস নিশ্চিত করার ওপর।

মাধুবালাকে বাঁচানোর লড়াই তাই কেবল একটি হাতির সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প নয়—বন্য প্রাণীকে মানুষের বিনোদনের জন্য বন্দি রাখার নৈতিকতা এবং তাদের প্রতি মানুষের দায়িত্বেরও এক কঠিন পরীক্ষা।