গণভোট কী? ভোটারদের যা যা জানা জরুরি

পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘গণভোট’-  যেখানে সিদ্ধান্তের ভাষা কেবল দুটি, ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। গণভোট হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট, যা কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব, আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে নেওয়া হয়। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে নাগরিকরাই সরাসরি সিদ্ধান্ত দেন। এটি সরাসরি গণতন্ত্রের একটি উপায়। এর মাধ্যমে নাগরিকরা সংবিধান সংশোধন, নীতি পরিবর্তন বা কোনো নেতার প্রতি আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত জানাতে পারেন।

যেকোনো সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের জন্য ভোটারের সামনে থাকে প্রার্থী, প্রতীক কিংবা দলীয় পরিচিতি। কিন্তু গণভোটের ক্ষেত্রে এসব কিছু থাকে না। সেখানে ব্যালটে থাকা প্রশ্নের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটারকে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ মত দিতে হয়।

গণভোট দুই ধরনের হতে পারে— বাধ্যতামূলক ও পরামর্শমূলক। বাধ্যতামূলক গণভোটে ফল আইনগতভাবে কার্যকর হয়। সংবিধান সংশোধনের মতো বড় সিদ্ধান্তে আইনের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গণভোটের আয়োজন করা হয়।

gonovote3

পরামর্শমূলক গণভোটের ফল নীতিনির্ধারকদের জন্য নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে, অনেকটা বড় পরিসরের জনমত জরিপের মতো। সরকার, সংসদের উদ্যোগ বা জনগণের পিটিশনের ভিত্তিতে এর আয়োজন করা হতে পারে। জনগণ চাইলে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্বাক্ষর সংগ্রহ করে এ উদ্যোগ নিতে পারে।

নাগরিকদের উদ্যোগে সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মোট ভোটারের ৫–১০ শতাংশের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। গণভোট সাধারণ নির্বাচনের থেকে ভিন্ন। সাধারণ নির্বাচনে প্রতিনিধিদের নির্বাচন করা হয়, কিন্তু গণভোটে নির্দিষ্ট একটি প্রশ্নের ওপর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়া হয়।

গণভোট কীভাবে হয়
গণভোট আয়োজন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়। দেশভেদে সংবিধান, নির্বাচন আইন ও গণভোটের ধরন অনুযায়ী এর কিছু পার্থক্য থাকে। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় কোনো উদ্যোগ বা প্রস্তাব থেকে। ভোটের বিষয় নির্ধারিত হলে পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েই প্রচারণা চালায়। গণমাধ্যম, সমাবেশ ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।

ভোটারদের সামনে একটি পরিষ্কার প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়—সাধারণত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ধরনের। নির্দিষ্ট তারিখে ভোট হয়। অনেক সময় সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গেও এটি অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ভোটার উপস্থিতি বেশি হয়। ভোটদান হতে পারে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে, ডাকযোগে বা ই-ভোটিং পদ্ধতিতে।

ভোট গণনা করে স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন বা সংস্থা। সাধারণত ৫০ শতাংশের বেশি ভোটই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, তবে কিছু দেশে (যেমন- সুইজারল্যান্ড বা ইতালি) ৬০ শতাংশ সমর্থন বা দ্বৈত শর্ত—অর্থাৎ ভোট ও অংশগ্রহণ উভয় ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা—প্রয়োজন হয়। ফল কয়েক দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হয়। প্রয়োজনে পুনর্গণনা বা আইনি আপিলের সুযোগ থাকে।

গণভোট বাধ্যতামূলক হলে এর ফল তাৎক্ষণিকভাবে বা কিছু সময় পর আইনি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। আদালত বৈধতা যাচাই করতে পারে। পরামর্শমূলক গণভোটের ক্ষেত্রে ফল সরকারকে নির্দেশনা দেয়, বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। গণভোটে কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে—যেমন কম ভোটার উপস্থিতি, প্রশ্নের ভাষা নিয়ে বিভ্রান্তি, অথবা রাজনৈতিক বয়কট।

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট
বাংলাদেশ খুব কম গণভোট আয়োজন করেছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়া সীমিত ছিল। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে।

এই তিনটি গণভোট মূলত নেতৃত্বের বৈধতা বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপ নির্ধারণে অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো সাধারণত সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে পরিচালিত হয়েছিল, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বৈধতা প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।

১৯৯১ সালের পর আর কোনো জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজনের আলোচনা শুরু হয়েছে।

১৯৭৭ সালের ৩১ মে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা’র প্রথম পাতা। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

১৯৭৭ সালের রাষ্ট্রপতি আস্থা গণভোট
গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয় ৩০ মে ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনের অধীনে। এটি ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি আস্থার ভোট। জিয়া ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা পরবর্তী বিশৃঙ্খলরা মধ্যে এক সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন।

প্রায় আড়াই বছরের পরিপূর্ণ সামরিক শাসনের পর, জিয়া জনগণের সমর্থন চাইতে গণভোট করেন। তার নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা। ভোটারদের কাছে প্রশ্ন ছিল— ‘আপনার কি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার নীতিমালা ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা আছে?’

৩ কোটি ৮৪ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে হ্যাঁ/না ভোট নেওয়া হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল চমকপ্রদভাবে ৮৮.১ শতাংশ এবং কোনো অবৈধ ভোট পড়েনি।

ভোটে জিয়াউর রহমান ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেন—৯৮.৯ শতাংশ ‌‘হ্যাঁ’ (৩৩.৪ মিলিয়ন ভোট) এবং মাত্র ১.১ শতাংশ ‘না’। এই ফল জিয়ার ম্যান্ডেটকে শক্তিশালী করে। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয় লাভ করেন।

১৯৮৫ সালের গণভোট হয় সামরিক আদেশে। ভোটগ্রহণের পরদিনের দৈনিক বাংলা। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

১৯৮৫ সালের সামরিক শাসন গণভোট
হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ১৯৮২ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ দেখা দেয়। পরে ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ তিনি একটি গণভোটের আয়োজন করেন। ভোটের মূল প্রশ্ন ছিল—এরশাদের নেতৃত্ব ও সংস্কারের প্রতি সমর্থন আছে কি না।

সরকারি হিসাবে প্রায় ৫ কোটি যোগ্য ভোটারের মধ্যে ৯৪.৮ শতাংশ ভোটার অংশ নেন। সরকারি ফলাফলে ৯৪.১ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট আসে। এরপর এরশাদ ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তবে এরশাদ ভোটে কারচুপি করেন বলে অভিযোগ আছে।

বিরোধীরা ভোট বয়কট করে এবং ভোটকে প্রতারণা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিচালিত বলে অভিযোগ করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও অনিয়ম দেখতে পেয়েছেন। সমালোচকরা এটিকে এরশাদের কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘায়িত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখেন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকেন।

১৯৯১ সালের গণভোট হয় রাষ্ট্রপতির শাসন ও সংসদীয় ব্যবস্থা নিয়ে। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

১৯৯১ সালের সংবিধান সংশোধনী গণভোট
গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অপসারণের পর। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার সামরিক শাসন শেষ হয়। পরবর্তীতে বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে। তখন রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল— রাষ্ট্রপতি ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে নাকি সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে।

দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃস্থাপনের জন্য প্রণীত হয়, যাতে রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যনির্বাহী ক্ষমতা রাখবেন। ভোটারদের কাছে প্রশ্ন ছিল—‘আপনি কি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ১৯৯১ সালের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধনী) বিল অনুমোদন দেওয়াকে সমর্থন করেন?’

৬ কোটি ২২ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৩৫.২ শতাংশ অংশ নেন, অর্থাৎ ২ কোটি ১৯ লাখ ভোট পড়ে। এর মধ্যে ৯৯.১ শতাংশ ভোট বৈধ ছিল। প্রস্তাবের পক্ষে প্রচুর সমর্থন আসে—৮৩.৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১৫.৬ ‘না’। এর ফলে সংশোধনী পাস হয় এবং সংসদীয় শাসনের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে কম ভোটার উপস্থিতি এবং বিএনপির সংসদীয় আধিপত্য বিতর্ক সৃষ্টি করে। গণভোটের পর সমালোচকরা উল্লেখ করেন যে, প্রণীত ব্যবস্থা এখনও নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংসদ এড়িয়ে সরকারি আদেশের সুযোগ রাখে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মাইলফলক হলেও ক্ষমতার অসমতা পুরোপুরি সমাধান করতে পারেনি।

আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এবার গণভোট নিয়ে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলো অন্তর্বর্তী সরকার।

গণভোট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো হলো-
১. জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই কেন্দ্রে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে।
২. সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতকৃত ভোটার তালিকাই হবে গণভোটের তালিকা।
৩. দুই ভোটের সময়সীমা একই থাকবে অর্থাৎ একই সময়ে দুই ভোট শুরু ও শেষ হবে।
৪. জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য আলাদা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালটবক্স ও ব্যালটপেপার থাকবে।
৫. নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা দুই ভোটের দায়িত্বেই নিয়োজিত থাকবেন।
৬. গণভোটে একটি প্রশ্ন থাকবে। সম্মতি জ্ঞাপন করলে 'হ্যাঁ'-তে, নাহলে 'না'-তে সিল দিতে হবে।
৭. প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে গণভোটে অংশ নিতে পারবেন।
৮. একইসময়ে দুই ভোটের গণনা চলবে। জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনা পদ্ধতির মতোই গণভোট গণনা চলবে।

গণভোটের অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ।

এতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটে উপস্থাপন করার লক্ষে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে।