১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ‘জুলাই সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জোরেশোরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও দেশবাসীকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে এই সনদে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন।
নিচে গণভোটের বিস্তারিত বিষয়বস্তু, বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে জুলাই সনদের পার্থক্য এবং ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ফলাফল কী হতে পারে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
গণভোটের ফলাফল ও বাধ্যবাধকতা
যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়: আগামী জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ২৭০ দিন বা ৯ মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। যদি সংসদ তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা সংশোধনী বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস বলে গণ্য হবে।
যদি ‘না’ জয়ী হয়: জুলাই সনদ বা এই সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো কার্যকর হবে না এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোই বহাল থাকবে।
জুলাই সনদ: বিদ্যমান সংবিধান বনাম প্রস্তাবিত সংস্কার
১. জাতীয় পরিচয় ও ভাষা
বর্তমান: সংবিধানে শুধু বাংলার স্বীকৃতি আছে। নাগরিকদের পরিচয় ‘বাঙালি’ হিসেবে নির্ধারিত।
জুলাই সনদ: রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে, তবে দেশের অন্য সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’।
২. সংবিধানের মূলনীতি
বর্তমান: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ।
জুলাই সনদ: সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি। সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
৩. প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতা কাঠামো
বর্তমান: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তিনি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানসহ একাধিক পদে থাকতে পারেন।
জুলাই সনদ: এক ব্যক্তি এক জীবনে দুই মেয়াদের বেশি (সর্বোচ্চ ১০ বছর) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে একাধিক লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না। (এতে বিএনপি ও ৪টি দলের আপত্তি রয়েছে)।
৪. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও আসন ব্যবস্থা
বর্তমান: এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ (৩০০ আসন)। নারীদের সংরক্ষিত আসন ৫০টি।
জুলাই সনদ: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ বিশিষ্ট ‘দ্বিকক্ষ সংসদ’ ব্যবস্থা। উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ এবং তা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে। নারীদের সংরক্ষিত আসন পর্যায়ক্রমে ১০০-তে উন্নীত করা হবে।
৫. রাষ্ট্রপতি ও তাঁর ক্ষমতা
বর্তমান: সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন। তাঁর ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
জুলাই সনদ: গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ উভয় সভার সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি একক ক্ষমতায় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও আইন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের নিয়োগ দিতে পারবেন। (এতে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে)।
৬. নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন
বর্তমান: দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।
জুলাই সনদ: সংবিধানে স্থায়ীভাবে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে সরকারি ও বিরোধী দলের ঐকমত্য প্রয়োজন হবে। নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে।
৭. বিচার বিভাগ ও ন্যায়পাল
বর্তমান: নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান থাকলেও কার্যকর নেই।
জুলাই সনদ: বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে শুধু আপিল বিভাগ থেকে। স্পিকারের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। (৭টি দলের আপত্তি রয়েছে)।
৮. জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার
বর্তমান: প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করেন, যা মৌলিক অধিকার স্থগিত করে।
জুলাই সনদ: জরুরি অবস্থা জারি করতে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
৯. প্রশাসনিক বিভাগ (কুমিল্লা ও ফরিদপুর)
জুলাই সনদ: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে ‘কুমিল্লা’ ও ‘ফরিদপুর’ নামে নতুন দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হবে।
ব্যালটে যা থাকবে
যদিও সংস্কার প্রস্তাব মোট ৮৪টি, তবে ব্যালট পেপারে ভোটারদের বোঝার সুবিধার্থে খুব সংক্ষেপে চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রশ্ন রাখা হবে। সেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে সমর্থন থাকলে ‘হ্যাঁ’ এবং না থাকলে ‘না’ ঘরে সিল মারবেন ভোটাররা।
গণভোটের ব্যালট পেপারে যে চারটি বিষয় থাকবে-
১. রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সংস্কার।
২. প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মেয়াদের সীমাবদ্ধতা।
৩. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।
৪. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া।