দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসঙ্কট নিরসন এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের বিশাল এক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে প্রায় সাত কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
ব্যারাজ কী এবং কেন এটি প্রয়োজন?
সাধারণ অর্থে ব্যারাজ হলো নদীর ওপর নির্মিত এমন এক অবকাঠামো যা পানির প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ না করে বরং নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। এতে অনেকগুলো গেট বা দরজা থাকে, যার মাধ্যমে পানির উচ্চতা ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিনের খরা ও লবণাক্ততার যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এই ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হবে, যেখানে ৭৮টি স্পিলওয়ে এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইস থাকবে।
কৃষি ও অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনা
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়াই, মধুমতী, বড়াল ও ইছামতীর মতো পাঁচটি প্রধান নদী তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। এর ফলে:
সেচ সুবিধা: প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদনে সহায়ক হবে।
মৎস্য সম্পদ: নদীগুলোর নাব্যতা ফিরলে মাছের উৎপাদন বছরে সোয়া দুই লাখ টন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুন্দরবন রক্ষা: মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়লে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও লবণাক্ততা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ শেষে সাতটি স্যাটেলাইট শহর এবং তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বিশেষজ্ঞদের মত ও সতর্কতা
বুয়েটের অধ্যাপক ড. আনিসুল হকের মতে, সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নির্মাণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে এই প্রকল্প থেকে বিশাল সুফল পাওয়া সম্ভব। অন্যথায় অর্থের অপচয় ও নদীর ক্ষতির ঝুঁকিও থাকে।
সরকার আগামী অর্থবছর থেকেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জিকে সেচ প্রকল্পেও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।