সারা দেশে ৫ মাসে ১১৮ শিশু ধর্ষণ

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নৃসংশতায় শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসে (জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত) সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আসকের তথ্যমতে, এই একই সময়ে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে অন্তত আরও ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই হত্যার শিকার হয়েছে ৪টি শিশু। প্রতিটি ঘটনাই সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের ওপর এই সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, একটি চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন (শিশু সুরক্ষা কমিশন) গঠন করা প্রয়োজন, যা শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের সুরক্ষায় সহায়তা করবে এবং অপরাধীদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি রাখবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ১২টি রাজনৈতিক দল ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর করলেও, তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষা কতটুকু আছে তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, বাইরের দেশে এই ধরনের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার মানুষদের সমাজে চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও আমাদের দেশে তা হয় না। ফলে শিশুরা এক অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে। অপরাধপ্রবণ মানুষদের কাছে অপরাধ করা বা কাউকে মেরে ফেলাটা এখন খুব সহজ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্ষকদের সামাজিকভাবেও চিহ্নিত করা জরুরি। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা বিধান এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণে রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতা ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।