আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাংলাদেশে অনলাইন পশুর হাটে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ক্রেতা কোরবানির পশু কিনতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন, যা দেশের ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশু বেচাকেনার সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, খামার মালিক ও অনলাইন ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে অনলাইন পশু বেচাকেনার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এখন অনলাইন লেনদেন, হোম ডেলিভারি ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ ডিজিটাল বিপণনের ওপর আগের চেয়ে বেশি আস্থা রাখছেন।
মাত্র কয়েক বছর আগেও অধিকাংশ ক্রেতা কোরবানির পশু কেনার আগে সরাসরি গরুরহাটে গিয়ে পশু দেখে কিনতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
তখন অনলাইনে গরু কেনাবেচাকে অনেক ভোক্তা অনিশ্চিত মনে করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে কোরবানির পশু কেনার বিষয়ে মানুষের আস্থা ছিল সীমিত।
তবে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সেই চিত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে।
বড় বাণিজ্যিক খামার থেকে শুরু করে ছোট কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারা এখন ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও লাইভ ভিডিও বিপণনের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে অনলাইনে কোরবানির পশুর প্রচার করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সুবিধা, সময় সাশ্রয় এবং বাড়তি স্বচ্ছতাকে ক্রেতারা ক্রমেই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি খামার জানিয়েছে, আগের বছরের তুলনায় এবার অনলাইনে সাড়া ও বিক্রি দুই-ই বেড়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বসিলা এলাকার পরিচিত গরুর খামার ‘মেঘডুবি অ্যাগ্রো’ জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে এ মৌসুমে প্রায় ৮০০টি গরু বিক্রি করেছে, যা আগের ঈদ মৌসুমগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
মেঘডুবি অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপক ওয়াহিদ বলেন, ‘এ বছর অনলাইনে আমাদের সাড়া অত্যন্ত ইতিবাচক।’
তিনি বলেন, ‘আগে ক্রেতারা অনলাইনে গরু কিনতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু এখন পুরো প্রক্রিয়াটি আরও পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য হওয়ায় তাদের আস্থা বেড়েছে।’
‘হাইজেনিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি’ জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি নতুন খামার বলছে, অনলাইন বিপণনের ফলে তাদের ক্রেতা সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মানিকগঞ্জের ‘সরকার অ্যাগ্রো’, যারা তিন বছর আগে মাত্র ৩০টি গরু নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল, অনলাইন চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এ বছর তাদের মৌসুমি গরুর সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ১৫০টিতে উন্নীত করেছে।
একইভাবে ‘পূর্বাচল ক্যাটল ফার্মিং’ জানিয়েছে, ঈদের আগেই তাদের প্রায় সব পশুর বুকিং সম্পন্ন হয়ে গেছে, যা ডিজিটাল গরু কেনাবেচা ব্যবস্থার প্রতি ক্রেতাদের বাড়তি আস্থার প্রতিফলন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণনের দ্রুত প্রসার এ খাতের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অনেক খামার এখন সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে পশু উপস্থাপনে পেশাদার আলোকচিত্র, লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং, ড্রোন ফুটেজ এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে পশু দেখানোর ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
এ ছাড়া পশুর ওজন, খাদ্যাভ্যাস, বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার বিস্তারিত তথ্যও অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
‘আমরা বুঝি, অনলাইনে গরু বেচাকেনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা,’ বলেন হাইজেনিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রির কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার আরেফিন।
তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা যে পশু কিনছেন, সে সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য চান। তাই আমরা স্বচ্ছতা ও গ্রাহকসেবার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে কয়েকটি খামার পশুচিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ও প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবস্থাও বজায় রাখছে।
মেঘডুবি অ্যাগ্রো জানিয়েছে, তাদের সব পশুই নিজস্ব উৎপাদিত খাদ্যে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লালন-পালন করা হয়, যাতে মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
একইভাবে সরকার অ্যাগ্রো জানিয়েছে, তারা নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত ঘাস ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু পালন করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই এবার বাজারে সবচেয়ে বেশি।
অধিকাংশ ক্রেতা ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে দামের গরুর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যেখানে সামর্থ্য ও মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
কয়েকটি খামার জানিয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে লালিত গরু এবং বিশেষ কিছু রঙের গরু, বিশেষ করে লাল রঙের গরুর প্রতি এ মৌসুমে ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারও অনলাইন পশু বেচাকেনার সম্প্রসারণকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এখন ক্রেতারা খামারে না গিয়েই মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে বুকিং ও অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন, ফলে পুরো কেনাকাটার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ করে নগরবাসীর মধ্যে অনলাইনে পশু কেনার জনপ্রিয়তা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে সুবিধাজনক কেনাকাটা।
তীব্র যানজট, ভিড়পূর্ণ গরুরহাট এবং ব্যস্ত কর্মজীবনের কারণে অনেক নগরবাসী এখন স্মার্টফোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাসা থেকেই কোরবানির পশু কিনছেন।
গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াতে অনেক খামার বিশেষায়িত পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও চালু করেছে।
রাজধানীর অধিকাংশ বড় গরুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় ঢাকার মধ্যে বিনা খরচে বাসায় পশু পৌঁছে দিচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরাসরি মাংস সরবরাহসহ পূর্ণাঙ্গ কোরবানি সেবাও দিচ্ছে।
পূর্বাচল ক্যাটল ফার্মের পরিচালনা ও বিক্রয় বিভাগের কর্মী সালমান বলেন, ‘ঝামেলামুক্ত এই সেবা ব্যবস্থা নগর পরিবারের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন নির্ভরযোগ্যতার পাশাপাশি সুবিধাও চায়।’
অনলাইন গরুরহাটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
বেশ কয়েকটি খামার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে তারা অনলাইনে অর্ডার পাচ্ছেন। তারা দেশের পরিবারের সদস্যদের জন্য কোরবানির পশু কিনছেন।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের পরও খাতটিতে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে বলে স্বীকার করেছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা, ঈদের সময় তীব্র যানজটের মধ্যেও সময়মতো পশু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অনলাইন প্রতারণা ঠেকানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
অনলাইন প্রতারণার আশঙ্কায় এখনো কিছু ক্রেতা ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতিকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছরই ক্রেতাদের আস্থা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোভিড-১৯ মহামারি শুরুতে অনলাইন গরুরহাটের প্রসার ত্বরান্বিত করেছিল। তবে এখন এটি প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবর্তিত ভোক্তা অভ্যাসের কারণে একটি টেকসই ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল ব্যবসাখাতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট সুবিধা, পরিবহন ব্যবস্থা ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আরও উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে অনলাইন পশু বিপণন আরও সম্প্রসারিত হবে।
‘গরু বেচাকেনার ভবিষ্যৎ ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে,’ বলেন ‘হাটবাজার.অনলাইন’ নামের একটি অনলাইন পেজের সঙ্গে যুক্ত খামারকর্মী হৃদয় সরকার।
তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা এখন সুবিধা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো সফলভাবেই সেই প্রত্যাশা পূরণ করছে।’
২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অনলাইন গরুরহাটের এই ব্যাপক উত্থান দেখাচ্ছে, কীভাবে প্রযুক্তি বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি ব্যবসাকে আধুনিক করে তুলছে।
দেশজুড়ে ডিজিটাল বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির পশু খাতও নতুন এক যুগে প্রবেশ করছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা কোরবানির অর্থনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠছে। সূত্র: বাসস