পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ ৪ মাস ধরে আটকে থাকার পর অবশেষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।
সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোররাত তিনটায় জাহাজটি সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। বর্তমানে জাহাজটি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) দক্ষ নৌ-কৌশলের কারণে জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু ও নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় এই চরম সংকট থেকে মুক্তি পেলেন।
বিএসসির তথ্যমতে, গত ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরানি কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
গত ১১ মার্চ জাবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাসের পর জাহাজটির কুয়েতে যাওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে বিএসসি জাহাজটিকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জাহাজটি সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় জাহাজটি রাস আল খায়ের বন্দরেই আটকে পড়ে।
পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলে জাহাজটি কেপটাউনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তবে ১০ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে গিয়ে এটি পুনরায় ইরানি কোস্ট গার্ডের বাধার মুখে পড়ে। নিরুপায় হয়ে জাহাজটি ওমানের মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙরে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় জাহাজটি অবশেষে মুক্ত হয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে সমর্থ হয়।
২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রু-এর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। বিএসসির কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, “আমাদের নাবিকদের সীমাহীন সাহসিকতা, সুনিপুণ নৌ-কৌশল এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এক চরম সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে তারা যে অসীম ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।”
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ অবরুদ্ধকালীন সময়ে নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি হতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধার অতিরিক্ত হিসেবে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য বিশেষ ‘ওয়ার ওয়েজ’ (War Wage) প্রদান করা হয়েছে।