আইনগত শূন্যতায় বাড়ছে কিশোরদের ই-সিগারেট ব্যবহার

আমদানি আদেশ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী ই-সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণার পর ছয় মাসে দেশে ই-সিগারেটের বিক্রি ১২ শতাংশ এবং ডেডিকেটেড ই-সিগারেট বিক্রয়কেন্দ্র ৫ শতাংশ কমেছে। তবে পরবর্তীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থেকে ই-সিগারেট-সংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ায় উৎপাদন, বিক্রয় ও বাজারজাতকরণে আইনগত শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। 

এর ফলে বাজার পুনরায় সম্প্রসারণের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত ই-সিগারেট নিষিদ্ধে কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর বনানীর হোটেল ওমনি রেসিডেন্সিতে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ই-সিগারেটের ক্রমবর্ধমান হুমকি: আটটি বিভাগীয় শহরে প্রাপ্যতার প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট (বাটা)-এর সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদ। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ও নীতিবিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সেতুর প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানা, গবেষক আমিনুল ইসলাম বকুল, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার আমিনুল ইসলাম সুজন, ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদসহ অন্যান্য বিশিষ্টজন। টিসিআরসি’র প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জুলহাস আহমেদ।

গবেষণার ফল তুলে ধরে মো. জুলহাস আহমেদ বলেন, দেশের ই-সিগারেটের বাজার এখনও মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। আটটি বিভাগীয় শহরে পরিচালিত গবেষণায় মোট ২৮৯টি বিক্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়, যার ৬৭ শতাংশই ঢাকায় অবস্থিত। 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৯৯ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে ই-সিগারেট ডিভাইস দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং একই হারে শিশু-কিশোরদের চোখের সমতলে (আই লেভেল) এসব পণ্য রাখা হয়েছে। এছাড়া ৯৮ শতাংশ দোকানে ই-লিকুইড প্রদর্শন করা হয় এবং ৮১ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে ‘১৮ বছরের নিচে বিক্রয় নিষিদ্ধ’—এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।

তিনি জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ই-সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অনানুষ্ঠানিক আমদানি, অনলাইন বিক্রয়, স্থানীয়ভাবে ই-লিকুইড উৎপাদন এবং বিদ্যমান আইনগত দুর্বলতার কারণে ই-সিগারেটের সহজলভ্যতা ও বাজার সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে, যা শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, বর্তমান আইনগত শূন্যতা ই-সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করছে। জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ই-সিগারেট ও অন্যান্য উদীয়মান তামাকপণ্য নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট, কার্যকর এবং বাস্তবায়নযোগ্য আইন প্রণয়ন জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, গবেষণাটি ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তিক দলিল হিসেবে কাজ করবে। সরকার, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও জনস্বাস্থ্য সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে ই-সিগারেটসহ সব ধরনের উদীয়মান তামাকপণ্য নিষিদ্ধে জাতীয় উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

শাগুফতা সুলতানা বলেন, ই-সিগারেট কোম্পানিগুলো পণ্যটিকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে প্রচারের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও নানা বাধা সৃষ্টি করছে। শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করতে ভেপ ফেয়ারসহ বিভিন্ন বিপণন কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব অপকৌশল বন্ধে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গবেষণায় ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস), ইলেকট্রনিক নন-নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনএনডিএস), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসসহ অন্যান্য উদীয়মান তামাকপণ্য নিষিদ্ধে পৃথক আইন প্রণয়ন; অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা ই-সিগারেট, ডিভাইস ও ই-লিকুইড জব্দ ও ধ্বংস; অনলাইন ও অফলাইন বিক্রয়, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধে কার্যকর নজরদারি; শিশু-কিশোরদের কাছে এসব পণ্যের সহজলভ্যতা রোধে বাজার তদারকি জোরদার; সীমান্ত ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে অবৈধ আমদানি বন্ধ এবং কর আরোপের মাধ্যমে ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকপণ্যের বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।