বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সংবিধান ও নাগরিকত্ব আইনের কয়েকটি বিধানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থাকা এবং একই সঙ্গে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ধারণ করা সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ নয়। তবে দ্বৈত নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্বের আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশের Citizenship Act, 1951-এর ১৪ ধারায় সাধারণভাবে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে বিধান রয়েছে। ওই ধারায় একই সঙ্গে বাংলাদেশের ও অন্য দেশের নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আইন ও পরবর্তী বিধানগুলোর কারণে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(c) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে, অথবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি দিলে, তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হবেন। তবে ৬৬(২A)-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব থাকা কোনো ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব নেওয়ার পর দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে, নির্দিষ্ট সাংবিধানিক উদ্দেশ্যে তাকে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না।
তাহলে দ্বৈত নাগরিকরা কী করতে পারবেন না?
১. বিদেশি নাগরিকত্ব রেখে সংসদ সদস্য হতে পারবেন না
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা সদস্য থাকার যোগ্যতা হারান।
অর্থাৎ, কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব ধরে রাখলে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ না করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সাংবিধানিকভাবে সমস্যাযুক্ত।
আর কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এমন অযোগ্যতার আওতায় পড়লে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে নিষ্পত্তির জন্য যেতে পারে।
২. রাষ্ট্রপতি হওয়া যাবে না
সংবিধানের ৪৮(৪)(b) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হতে হয়। ফলে বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে কেউ যদি ৬৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হন, তাহলে তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতাও পূরণ করেন না।
৩. প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রেও একই সাংবিধানিক বাধা রয়েছে
প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের কাঠামো অনুযায়ী সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিদেশি নাগরিকত্ব ধরে রেখে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য কোনো ব্যক্তি সাধারণ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথেও যেতে পারেন না। এখানে মূল বাধাটি প্রধানমন্ত্রীর পদে আলাদা কোনো ‘দ্বৈত নাগরিক নিষেধাজ্ঞা’ নয়; বরং সংসদ সদস্য হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা।
৪. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার ক্ষেত্রেও নাগরিকত্বের শর্ত রয়েছে
সংবিধানের ৯৫(২) অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত পেশাগত যোগ্যতাও থাকতে হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: শুধু দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার কারণে বিচারক হওয়া সরাসরি নিষিদ্ধ—এমন নির্দিষ্ট ভাষা ৯৫ অনুচ্ছেদে নেই। তাই এ বিষয়ে শুধু ৬৬ অনুচ্ছেদের বিধান প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না; সংশ্লিষ্ট নিয়োগ আইন ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যাও বিবেচনা করতে হবে।
দ্বৈত নাগরিক কি বাংলাদেশে ভোট দিতে পারেন?
সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ভোটার হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
অতএব, শুধু অন্য দেশের নাগরিকত্ব থাকার কারণে বাংলাদেশি নাগরিকের ভোটাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়—এমন কথা সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদে নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাংলাদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে বহাল আছে কি না এবং ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার অন্যান্য শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বৈত নাগরিক কি বাংলাদেশে ব্যবসা করতে পারেন?
দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসা বা বিনিয়োগ করা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ—এমন কোনো সাধারণ সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা, সম্পত্তি, বিনিয়োগ বা খাতের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকের জন্য আলাদা বিধিনিষেধ থাকলে তা প্রযোজ্য হতে পারে।
অর্থাৎ দ্বৈত নাগরিক হওয়া মানেই বাংলাদেশে ব্যবসা করা, সম্পদ রাখা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ—এমন সরল নিয়ম নেই। বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট খাতের আইন ও নাগরিকত্বের আইনগত অবস্থার ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি—
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা এবং বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা একেবারে একই বিষয় নয়। সংবিধানের ৬৬(২)(c)-তে দুটিকেই সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ৬৬(২A) বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করার পর বাংলাদেশি নাগরিকের সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে বিশেষ বিধান দিয়েছে।
বাংলাদেশের আইন দ্বৈত নাগরিকদের সব ধরনের নাগরিক ও অর্থনৈতিক অধিকার একসঙ্গে বাতিল করে না। তবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র—বিশেষ করে সংসদ সদস্য হওয়া এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদগুলোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব বড় সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সংবিধানের ৬৬(২A)-এর শর্ত অনুযায়ী পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
আইনি নোট: এটি একটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, ব্যক্তিগত আইনি পরামর্শ নয়। দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের ধরন, কোন দেশের নাগরিকত্ব, কীভাবে তা অর্জিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সরকারি পদ—এসবের ওপর আইনি ফল ভিন্ন হতে পারে।