জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মানুষের জীবন আরও কঠিন হবে: শামসুল আলম

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের কারণ দেখিয়ে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে এবং মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। নতুন দর অনুযায়ী, ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। রোববার রাত ১২টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

সরকার এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। একই সময়ে পেট্রলের দাম ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। কেরোসিনের দামও ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছিল। এরপর জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ডিজেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা।

দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে এম শামসুল আলম দেশের একটি প্রথম সারির গণমাধ্যমকে বলেন, সরকার এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়ানো হতে পারে। এতে মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে শামসুল আলম বলেন, ১৪ লাখ মানুষের বেতন বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাকিদের বেশির ভাগের অবস্থা করুণ। মানুষের যদি কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে শুল্ক-কর আসবে কোথা থেকে? তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার যতটুকু ভর্তুকি কমাবে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে জ্বালানি বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও গত পাঁচ মাস দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এবং জাহাজভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে দাবি করেছে জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকলে পাশের দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি থাকে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশে একলাফে জ্বালানি তেলের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করেছিল। পরে সমালোচনার মুখে ৫ টাকা কমানো হয়। ওই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবহনভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।