বন্দরের ছবি-ভিডিও প্রকাশে নতুন বিধিনিষেধ, কারণ নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রামে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং অপারেশনাল তথ্যের ছবি-ভিডিও ধারণ ও প্রকাশে নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমে এসব তথ্য, ছবি বা ভিডিও প্রকাশ না করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে বন্দরটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘ক’ শ্রেণির কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন (KPI) হওয়ায় এর নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল অবকাঠামোর সুরক্ষা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

কী কী বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা
নতুন নির্দেশনায় অনুমতি ছাড়া বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নজরদারি ও যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি ও ভিডিও ধারণ, স্কেচ তৈরি কিংবা দৃশ্যমান তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

শুধু ছবি বা ভিডিও ধারণ নয়, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা গণমাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার বিন্যাস ও ‘অপারেশনাল তথ্য’ প্রকাশকেও ‘সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অননুমোদিত তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের কারণে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন, নিরাপত্তা বিধিমালা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তার যুক্তি কর্তৃপক্ষের
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সম্প্রতি বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তি ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। এমনকি কোথাও কোথাও সরাসরি সম্প্রচারের ঘটনাও ঘটছে। এতে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তার স্বার্থেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বন্দরে গিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারেন।

আইনে যা আছে
নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ১২ ধারা এবং Official Secrets Act, 1923-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ১২ ধারায় বন্দরের সুষ্ঠু পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্দরসীমার অন্তর্ভুক্ত সব স্থান ও স্থাপনাকে ‘সংরক্ষিত বন্দর এলাকা’ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ধারা ১২ মূলত বন্দরে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে; গণমাধ্যমে বন্দরের সাধারণ কার্যক্রম বা অপারেশনাল তথ্য প্রকাশের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ওই ধারায় সরাসরি উল্লেখ নেই। ফলে নতুন নির্দেশনার পরিধি নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে Official Secrets Act-এর 3A ধারায় সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বা নিরাপত্তার স্বার্থে ‘notified’ কোনো স্থান বা এলাকার ছবি, স্কেচ, প্ল্যান বা প্রতিনিধিত্বমূলক তথ্য লিখিত অনুমতি ছাড়া ধারণের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ধরনের বিধান লঙ্ঘন করলে কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে আইনটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো স্থানকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ‘prohibited place’ হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি সরকার ঘোষণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের পুরো এলাকা এবং এর প্রতিটি অপারেশনাল তথ্য একইভাবে ওই আইনের আওতায় পড়বে কি-না এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এখন এই নির্দেশনা?
নতুন নির্দেশনার সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি বন্দর এলাকায় আন্দোলন চলছে। বন্দর রক্ষা কমিটি এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছে। এর মধ্যেই বন্দরের বিভিন্ন স্থানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং এনসিটি-সংক্রান্ত বিতর্ক তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন নির্দেশনা আসায় এর সময় ও ব্যাপ্তি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্দেশনাটির সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক বিতর্কের সম্পর্ক নেই; মূল উদ্দেশ্য বন্দর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বনাম নিরাপত্তা
বন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। আন্তর্জাতিকভাবে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কিছু অংশে ছবি ও ভিডিও ধারণ নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বন্দরের জাহাজজট, কনটেইনার জট, পণ্য খালাসের গতি, টার্মিনালের সক্ষমতা কিংবা কার্যক্রমের প্রতিবন্ধকতার মতো বিষয় জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ফলে নিরাপত্তার নামে ‘অপারেশনাল তথ্য’ শব্দটির পরিধি যদি অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়, তাহলে সংবাদ সংগ্রহ ও জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও নতুন নির্দেশনাকে গণমাধ্যমের কাজ সীমিত করার সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কোন তথ্য নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল এবং কোনটি সাধারণ জনস্বার্থের তথ্য, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।