খতিয়ানে জমির দাগ নম্বর নেই? কোথায় যাবেন, কীভাবে সংশোধন করবেন

জমির দলিল আছে, নামজারি করা হয়েছে, নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন করও দেওয়া হচ্ছে—কিন্তু খতিয়ানে নিজের জমির দাগ নম্বর নেই। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জমিটি কি তাহলে রেকর্ডের বাইরে চলে গেছে? ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, উত্তরাধিকার হস্তান্তর কিংবা মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে কি না?

ভূমি-সংক্রান্ত কাজে এমন অসংগতি দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে ভুলের ধরন শনাক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, খতিয়ানে দাগ নম্বর বাদ পড়া মানেই জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। আবার দলিল থাকলেই খতিয়ানের ভুল উপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নির্দেশনায় খতিয়ানে দাগ নম্বর ভুল লেখা কিংবা কোনো দাগ ভুলক্রমে বাদ পড়াকে করণিক ভুলের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশোধনের পদ্ধতি নির্ভর করবে ভুলটি কীভাবে হয়েছে, রেকর্ড কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং অন্য কারও স্বত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না—তার ওপর।

প্রথমে খুঁজে বের করুন, দাগ নম্বরটি কোথায় বাদ পড়েছে

খতিয়ানে দাগ নম্বর না থাকলে প্রথম কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মৌজার নকশা ও অন্যান্য রেকর্ডের সঙ্গে খতিয়ান মিলিয়ে দেখা।

দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট দাগ নম্বরটি মৌজা নকশায় রয়েছে কি না, আগের জরিপের খতিয়ান বা নকশায় কী তথ্য আছে এবং সর্বশেষ জরিপে জমিটি কোন দাগের অধীনে রেকর্ড হয়েছে। প্রয়োজনে সাবেক ও হাল দাগের মধ্যে সম্পর্কও যাচাই করতে হবে।

যদি নকশা ও রেকর্ডের মূল খতিয়ান বহিতে দাগটি সঠিকভাবে থাকে, কিন্তু মালিকের প্রাপ্ত খতিয়ানে তা না থাকে, তাহলে এক ধরনের সমস্যা। অন্যদিকে, নকশায় দাগ আছে কিন্তু খতিয়ানে নেই, কিংবা নকশা ও রেকর্ডের তথ্যের মধ্যেই অমিল রয়েছে—তাহলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করতে হবে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর নকশায় ভুলক্রমে দাগ নম্বর না বসা, দাগ নম্বরের অস্পষ্টতা এবং দাগের সীমানা বা আয়তনের অসংগতিকে নকশা-সংক্রান্ত ত্রুটির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

কোন কোন কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন

সংশোধনের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা ভালো। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংগ্রহ করতে পারেন—

সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি—সম্ভব হলে সার্টিফায়েড বা প্রত্যয়িত অনুলিপি।

সংশ্লিষ্ট মৌজার নকশা বা ম্যাপ।

জমির মূল দলিল এবং আগের মালিকদের দলিল, যদি থাকে।

সাবেক ও হাল দাগের তথ্য এবং আগের জরিপের খতিয়ান।

নামজারি খতিয়ান ও নামজারি-সংক্রান্ত আদেশ, যদি থাকে।

ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ।

উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া হলে ওয়ারিশ সনদসহ প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র।

প্রয়োজনে জমির অবস্থান, সীমানা ও দখল সম্পর্কে সহায়ক প্রমাণ।

সব কাগজ প্রত্যেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। মূল উদ্দেশ্য হলো—জমিটি কোন দাগের অন্তর্ভুক্ত, আবেদনকারীর স্বত্বের ভিত্তি কী এবং রেকর্ডে ভুলটি কোথায় হয়েছে, তা প্রমাণ করা।

চূড়ান্ত খতিয়ানে ভুল থাকলে কোথায় আবেদন করবেন

সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর তাতে করণিক ভুল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি পিডিয়ার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩ ধারার বিধান অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের নির্দিষ্ট ধরনের ভুল সংশোধনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ক্ষমতাপ্রাপ্ত। এ ধরনের ভুলের মধ্যে দাগ নম্বর ভুল লেখা বা দাগ বাদ পড়ার বিষয়ও রয়েছে।

আবেদনে সাধারণত উল্লেখ করতে হবে—

১. জমির পরিচিতি—জেলা, উপজেলা, মৌজা, জরিপের ধরন ও খতিয়ান নম্বর।

২. যে দাগ নম্বরটি বাদ পড়েছে, তার পরিচয় এবং জমির পরিমাণ।

৩. দাগ নম্বরটি বাদ পড়ার কারণে কী অসংগতি তৈরি হয়েছে।

৪. সংশ্লিষ্ট নকশা, দলিল, আগের খতিয়ান ও অন্যান্য প্রমাণের বিবরণ।

৫. কী ধরনের সংশোধন চাওয়া হচ্ছে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথি ও প্রমাণ যাচাই করতে পারে, শুনানির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ডাকতে পারে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন নিতে পারে।

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে: সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, চূড়ান্ত খতিয়ানে কোনো দাগ ভুলক্রমে বাদ পড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংশ্লিষ্ট জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার মতামত নেবেন। অর্থাৎ, আবেদন করলেই দাগ নম্বর যুক্ত হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

জরিপ চলমান থাকলে করণীয় আলাদা

জরিপের খসড়া রেকর্ড বা ডিপি প্রকাশের সময় ভুল ধরা পড়লে চূড়ান্ত প্রকাশনার জন্য অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি জানানো উচিত।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, খসড়া প্রকাশনার পর্যায়ে রেকর্ডের ভুল নিয়ে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে আপত্তি মামলা করা যায়। আপত্তির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী আপিলের সুযোগও রয়েছে।

তাই খতিয়ানের অবস্থা আগে নিশ্চিত করা জরুরি—এটি এখনো খসড়া পর্যায়ে, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত। পর্যায় অনুযায়ী সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করাই সময় ও অর্থ বাঁচানোর উপায়।

অন্যের জমির সঙ্গে দাগ অদলবদল হলে কী হবে?

সব ভুলকে সাধারণ করণিক ভুল ধরে সংশোধন করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, দুটি খতিয়ানে পরস্পরের দাগ নম্বর অদলবদল হয়েছে এবং তা সংশোধন করলে অন্য মালিকের স্বত্ব বা জমির পরিমাণ বদলে যেতে পারে—এমন ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।

ভূমি পিডিয়ার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো সংশোধনে অন্যের স্বত্বের পরিবর্তন ঘটলে বা কেউ লাভবান কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজস্ব কর্মকর্তার সাধারণ করণিক ভুল সংশোধনের ক্ষমতা প্রযোজ্য নাও হতে পারে। শুনানিতে প্রকৃত স্বত্ববিরোধ দেখা দিলে সেটি দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে জমির সব কাগজপত্র নিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যুক্তিযুক্ত। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে। তবে কোন প্রতিকার প্রযোজ্য হবে, তা নথি ও বিরোধের প্রকৃতি যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।

সংশোধনের খরচ কত?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ভূমিসেবার ফি-তালিকায় খতিয়ান সংশোধনের আবেদন ফি ২০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি নির্দিষ্ট সেবার আবেদন ফি; নকল সংগ্রহ, ম্যাপ, ডাক বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ার খরচ আলাদা হতে পারে। আবেদন করার আগে সরকারি ফি-তালিকা দেখে বর্তমান হার যাচাই করা উচিত। 

সরকারি ফি ছাড়া অপ্রয়োজনীয় অর্থ দাবি করা হলে রসিদ চাইতে হবে। দালালের মাধ্যমে কাজ করানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ভূমি বা সেটেলমেন্ট অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করাই নিরাপদ।

অনলাইনে তথ্য যাচাই করবেন যেভাবে

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি খতিয়ান অনুসন্ধান ব্যবস্থায় মৌজা, খতিয়ান নম্বর, মালিকের নাম, সাবেক ও বর্তমান দাগ নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য দিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। "সরকারি খতিয়ান অনুসন্ধান পোর্টাল"/> থেকে তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের থেকে ভূমিসেবা ও ফি-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়।

অনলাইনে তথ্য না পাওয়া মানেই জমির অস্তিত্ব নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। পুরোনো রেকর্ড, জরিপের পর্যায় বা তথ্যভান্ডারের সীমাবদ্ধতার কারণে অনুসন্ধানে ফল নাও আসতে পারে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে প্রত্যয়িত নথি সংগ্রহ করে যাচাই করা প্রয়োজন।

খতিয়ানে জমির দাগ নম্বর বাদ পড়লে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত ভুল শনাক্ত করা এবং প্রমাণসহ সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা। প্রথমে খতিয়ান ও মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখুন; এরপর দলিল, আগের রেকর্ড ও নামজারির কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। জরিপ চলমান থাকলে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি জানান, আর চূড়ান্ত রেকর্ডে করণিক ভুল হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে প্রতিকার সম্পর্কে জানুন।

ভুলটি যদি অন্যের স্বত্বকে প্রভাবিত করে, তাহলে সাধারণ সংশোধন আবেদনের বাইরে আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে। সঠিক নথি যাচাই এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়াই জমির অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।