জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে নাহিদের পদত্যাগ

জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গঠিত হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক দল। শিক্ষার্থীদের অর্জন ধরে রাখতে এই দলের অভ্যুদয় যা বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। বিপ্লবীদের নতুন দল গঠন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মত পার্থক্য রয়েছে। দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল প্রথম থেকেই নতুন দল সরকারের উদ্যোগে হচ্ছে এমন অভিযোগ করে আসছে। তারা সরকারে থেকে দলগঠনকে সন্দেহের চোখে দেখছে। যদিও তাদের দলীয় উত্থানটির পিছনের কাহিনী ছিল সরকারি সুযোগ সুবিধা ষোলআনা- অবশ্য বিষয়টি তারা ভুলে যেতে চান।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব সামলে আসা নাহিদ  মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তার পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বেলা ২টায় তিনি যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এ সময় ফটোসেশনও হয়েছে। 

এ বিষয়ে কথা বলতে নাহিদ ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা অনির্ধারিত বৈঠকে বসে। দুপুর আড়াইটার দিকে যমুনার সামনে এ বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানানো হয়।

গত কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল আসছে। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও বেশ কয়েকবার জানিয়েছিলেন পদত্যাগ করেই তিনি নতুন দলে যোগ দেবেন। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তার পদত্যাগের মধ্যদিয়ে সে পথ অনেকটা সুগম হলো। আগামী  ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) ছাত্রদের পক্ষ থেকে নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হবে।

রাজধানীর মানিকমিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। নতুন এ দলের নাম না জানা গেলেও এর নেতৃত্বে নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব হবেন আকতার হোসেন থাকবেন বলে জানা গেছে। আর দলটি আগামী শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে ব্যাপক জমায়েতের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করবে। জমায়েতে লোকবল বাড়াতে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। 

এছাড়াও দলের নীতি আদর্শ বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। মূলত স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এলেও সাধারণ মানুষের পছন্দের দলের খোঁজ মেলেনি। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই নতুন দলটির আর্বিভাব বলে দল গঠনে সক্রিয় একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।


  
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন:
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র জনতার প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্বে আসা নাহিদ ইসলাম সাড়ে ছয় মাসের মাথায় সেই দায়িত্ব ছাড়লেন ‘ছাত্র-জনতার কাতারে’ ফিরে যাওয়ার জন্য। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব সামলে আসছিলেন নাহিদ। মঙ্গলবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র দেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে যে নতুন রাজনৈতিক দল আসতে যাচ্ছে, তাতে যোগ দিতেই সরকারের দায়িত্ব ছাড়লেন এই তরুণ নেতা। পদত্যাগপত্রের শুরুতেই নাহিদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত সহযোদ্ধাদের কথা ‘শ্রদ্ধাভরে’ স্মরণ করছেন। রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পরে ছাত্র-জনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘পরিবর্তিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের’ দায়িত্ব নেওয়ায় নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। 

নাহিদ লিখেছেন, ‘ বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়তে আপনার নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে আমাকে সুযোগ দানের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। গত ৮ই অগাস্ট শপথ নেওয়া উপদেষ্টা পরিষদে আমি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাই। নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আপনার নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট থেকেছি।’

এরপর নিজের পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ লিখেছেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমার ছাত্র-জনতার কাতারে উপস্থিত থাকা উচিত মর্মে আমি মনে করি। ফলে আমি আমার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়া সমীচীন মনে করছি।’

আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল নেতাদের সম্মুখ সারিতে রেখে ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার)আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হবে। নাহিদকে সেই দলের আহ্বায়কের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। ৩৬ দিনের যে আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন, তার অগ্রভাবে ছিলেন নাহিদ ইসলাম। তখন তিনি ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা থেকে শুরু করে বিক্ষোভের ময়দানে দিনের পর দিন সোচ্চার নেতৃত্বে দেখা গেছে ২৬ বছরের এই তরুণকে। সেজন্য তাকে যেতে হয়েছে ‘আয়নাঘরেও’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা নাহিদের ডাক নাম ফাহিম। তার বাড়ি ঢাকার খিলগাঁও দক্ষিণ বনশ্রীতে। দুই বছর আগে ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক আখতার হোসেনেরে নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ছিলেন নাহিদ। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এই সংগঠনের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নতুন রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র এবং মুখ্য সংগঠক পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম থাকার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ পদগুলোতে নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, তাসনিম জারা ও আরিফুল ইসলাম আদীব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ থাকবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে নাহিদ ইসলামকে ট্যাগ করে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক সারজিস আলম দুপুরে ফেসবুক দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার। রাজপথে স্বাগতম সহযোদ্ধা।’