আজ থেকে শুরু হলো বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গৌরবোজ্জ্বল মাস—মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই মাসেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল। ডিসেম্বর তাই একদিকে যেমন উৎসবের, তেমনি অন্যদিকে লাখো শহীদ আর সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের আত্মত্যাগের বেদনাবিধুর স্মৃতির মাস।
দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের এই ডিসেম্বরের শুরুতেই যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। স্বাধীনতাকামী বাঙালি গেরিলা ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে কোণঠাসা হতে থাকে দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তখন থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ রক্ষা হচ্ছে না। পরাজয়ের আভাস পেয়ে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করতে থাকে।
নিউইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা বাহিনীর ব্যাপক সাফল্য এবং এর বিপরীতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা বৃদ্ধির খবর প্রকাশ করে।
অবশেষে সকল প্রতিরোধ ভেঙে যায়। ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মাথা নত করে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ-এর।
বাঙালি জাতিসত্তার হাজার বছরের স্বপ্নপূরণ হয় এই বিজয়ের মাসে। ভাষার ভিত্তিতে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম, তা পূর্ণতা পায় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। বাঙালিরা লাভ করে নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব জাতীয় পতাকা—যা বিশ্বের দরবারে এক স্বাধীন জাতি হিসেবে তাদের আত্মপরিচয় নিশ্চিত করে।
প্রতি বছরের মতো এবারও জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযথ মর্যাদায় বিজয়ের এই মাসটি উদযাপন করবে। বিজয়ের মাসকে ঘিরে এরই মধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য থাকবে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী লাখো শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও মাসব্যাপী আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
এই ডিসেম্বরে, উৎসবের উল্লাসের পাশাপাশি জাতি গভীর শোক ও বেদনার সাথে স্মরণ করবে সেইসব সূর্যসন্তানদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।