ডিজিটাল নিরাপত্তায় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি

ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন শুধু কম্পিউটার বা নেটওয়ার্ক নিরাপদ রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও তথ্যের অধিকার।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত হ্যাকিং, ভাইরাস, অ্যাকাউন্ট দখল কিংবা বড় ধরনের সাইবার হামলার কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল, ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের অপব্যবহার, অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে অর্থ দাবি কিংবা কর্মীর অসতর্কতায় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস—সবই ডিজিটাল নিরাপত্তার অংশ।

সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি নিয়ে দেশের বর্তমান বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত সাইবার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা অনেক সময় প্রযুক্তি নয়, মানুষের অসচেতনতা। যাচাই না করে কোনো লিংকে প্রবেশ করা, অপরিচিত ব্যক্তিকে OTP বা লগইন তথ্য দেওয়া, একই পাসওয়ার্ড একাধিক জায়গায় ব্যবহার করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা—এসব ছোট ভুল বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের ফলে ঝুঁকির ধরনও বদলে যাচ্ছে। এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, অডিও ও ভিডিও যেমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি বিশ্বাসযোগ্য ভাষায় তৈরি প্রতারণামূলক বার্তাও মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। তাই অনলাইনে কোনো তথ্য দেখলেই বিশ্বাস না করে যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রযুক্তির সবচেয়ে সক্রিয় ব্যবহারকারীদের একটি। তাই তাদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুললেই হবে না; প্রযুক্তির ঝুঁকি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অনলাইন আচরণ সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট বেশি মানুষ শেয়ার করছে বলেই সেটি সত্য—এমন ধারণা বিপজ্জনক। কোনো ছবি বাস্তব মনে হলেই সেটি বাস্তব নয়। পরিচিত ব্যক্তির নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলেই সেটি ওই ব্যক্তির—এমন নিশ্চয়তাও নেই। তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস তাই নিরাপদ ডিজিটাল নাগরিকত্বের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু আইটি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। একজন কর্মীর অসতর্কতা যেমন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা একটি সম্ভাব্য বিপদ আগেই প্রতিরোধ করতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করা। কেউ অনলাইন প্রতারণার শিকার হলে ‘কেন বিশ্বাস করলেন?’—এই প্রশ্নের চেয়ে ‘কীভাবে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়?’—এই প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভুক্তভোগীকে সহযোগিতা করার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ব্যবহারকারী—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন, প্রযুক্তি ও তদন্ত সক্ষমতাকেও আধুনিক করতে হবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনায় আনতে হবে। সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু ‘হ্যাক হওয়া থেকে বাঁচার’ বিষয় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক আস্থা, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তাই প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ শুধু শক্তিশালী সার্ভার, উন্নত সফটওয়্যার বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হবে না। তৈরি হবে সচেতন মানুষ দিয়ে—যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন দায়িত্বশীলভাবে, তথ্য যাচাই করবেন এবং নিজের পাশাপাশি অন্যের ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেবেন।

সাইবার নিরাপত্তা তাই কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ সমাজের নিরাপত্তার বিষয়।

লেখক: সাইবার বিশেষজ্ঞ